সরকারি চাকরিরত অবস্থায় শৃঙ্খলা বিধি ভঙ্গ করে ব্যবসা পরিচালনা, মালপত্র বুঝে না নিয়ে কোটি কোটি টাকা বিল পরিশোধ, লাখ লাখ টাকার ওভিসি তৈরি করে প্রচার না করা, বিল ভাউচার ছাড়াই প্রশিক্ষণের জন্য অর্ধকোটি টাকা অনুমোদনসহ অসংখ্য অভিযোগ যার বিরুদ্ধে, তিনি অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। গত ১৮ আগস্ট সরকার তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন একজনকে অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যার বিরুদ্ধে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ এসেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে যখন সংস্কারের আওয়াজ উঠেছে, তখন নানা অনিয়মে অভিযুক্ত কাউকে মহাপরিচালক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, তিনি মূলত একজন সুবিধাবাদী লোক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আস্থাভাজন ছিলেন, আবার বর্তমান সরকারেরও আস্থাভাজন।
সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ২০১৮ অনুসারে সরকারি চাকরিরত অবস্থায় কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো ধরনের ব্যবসা করতে পারবেন না। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নবনিযুক্ত মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বেসরকারি এএমজেড হাসপাতালের একজন মালিক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রদত্ত হাসপাতালের লাইসেন্সে দেখা যায়, মালিকানা তালিকায় তার নাম ১১ নম্বরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন চিকিৎসক পেশাজীবী হিসেবে তিনি চেম্বার করতে পারবেন, কনসালটেন্সি করতে পারবেন। কিন্তু নিজ নামে ব্যবসা পরিচালনা শৃঙ্খলা বিধির পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
জানা গেছে, ডা. রোবেদ আমিনের বিরুদ্ধে ২০২১-২২ অর্থবছরে কেনাকাটায় অডিট আপত্তি এসেছে। সেখানে ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ৩২০ টাকার অডিট আপত্তির মধ্যে ২ কোটি ৮৯ লাখ ৮৪ হাজার টাকাই এমএসআর (মেডিকেল সার্জিক্যাল রিক্যুইজটি) কেনাকাটার। এটাকে আর্থিক ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা এসব কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা হলেও মালপত্র বুঝে নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে কোনো ভাউচার ছাড়াই ১০ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ টাকার বিল প্রদান করা হয়েছে। একটি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৬৯ হাজার ৫০০ টাকার বিল দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রশিক্ষণ ছাড়াই ৫৭ লাখ ৮৩ হাজার ৫২০ টাকার বিল পরিশোধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রাক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা।
এসব আপত্তির বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যায় ডা. রোবেদ আমিন বলেছিলেন, ‘আপত্তিতে বর্ণিত কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক খাতের ব্যয়টি অপারেশন প্ল্যানের আওতাবহির্ভূত নয়। কেননা অপারেশনাল প্ল্যানের মেজর অ্যাক্টিভিটিসে বলা আছে, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ নিয়ন্ত্রণের জন্য এর কার্যক্রম শুধু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। নোয়াখালী জেলার আব্দুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল একই সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রমে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকায় অধ্যক্ষের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ওই প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের এনসিডিসি কর্নার ও ল্যাব উন্নয়নের কাজে ব্যয়ের জন্য অধ্যক্ষ বরাবর অর্থ আইভাসের মাধ্যমে ন্যস্ত করা হয়েছে। এই অর্থ যথানিয়মে ব্যয় করা হয়েছে মর্মে অধ্যক্ষ জানিয়েছেন। অতএব আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য অনুরোধ করা হলো।’
জানা গেছে, ডা. রোবেদ আমিন কটি ওভিসি (অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়াল) তৈরির জন্য ব্যয় করেছেন ৪ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। মিডিয়াবিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ওই পরিমাণ বিল দেওয়া হলেও ওভিসিটি কোথাও প্রচার হতে দেখা যায়নি।
ওই ব্যয়ের পক্ষে ফাইল নোটে লেখা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি ২০১৭-২০২৪ (এইচপিএনএসপি) এর আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের অর্পিতে (অপারেশন প্ল্যান) এর বরাদ্দের ভিত্তিতে মেজর এনসিডি কম্পোন্যান্ট ২০২৩-২৪ অর্থবছরে (অডিও ও ভিডিও তৈরি ব্যয়) কোডে জিওবি খাতে প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানে আরএপকিউ করার অনুমোদন আছে। ওই প্রোগ্রাম থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে বিশ্ব উচ্চরক্তচাপ দিবস এবং বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস উদযাপন করা হয়। এই দুটি দিবসের তাৎপর্য বিবেচনা ও দেশের প্রতিটি উপজেলায় অবস্থিত এনসিডি কর্নারে বিনামূল্যে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস রোগের ওষুধ বিতরণ করা হয়। এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়াল (ওভিসি) সিরিজ-০৩ তৈরি করা প্রয়োজন, যা পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হবে। ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর এটি সই করেন অধ্যাপক রোবেদ আমিন। তবে ৫ লাখ টাকার সেই ওভিসি কোথায় সম্প্রচার করা হয়েছে, তা কেউ বলতে পারেন না।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, ‘এসব পুরোপুরি মিথ্যা কথা। সারাজীবন শুধু ডাক্তারি করেছি। কোনো ধরনের ব্যবসা করিনি। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করাটা ব্যবসা কি না, জানি না। প্র্যাকটিস করার রাইট তো আমার আছে। এনসিডিসি কর্নারে ওষুধ কেনাকাটায় যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তা ভিত্তিহীন। কর্নারের ওষুধ তো সরকারি প্রতিষ্ঠান ইডিসিএল থেকে কেনা হয়েছে। এনসিডিসি কর্নারে সারা দেশে কীভাবে ওষুধ-ইনসুলিন কেনাকাটা ও রোগীদের দেওয়া হয়েছে, সেটা সরেজমিন দেখলে প্রমাণ পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণের বিষয়ে যদি বলি, আমরা সব ট্রেনিং সম্পন্ন করেছি। ট্রেনিংগুলো হয়েছে বারডেম, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে। আমরা অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি, ওরা ট্রেনিং করিয়েছে। এখানে তো আমার অনিয়ম করার সুযোগ নেই। যন্ত্রপাতি যেসব কেনা হয়েছে, সেগুলো এখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখায় ব্যবহার করা হচ্ছে। কাজেই এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’