মিথ্যা ঘোষণা থেকে শুরু করে আমদানিনিষিদ্ধ পণ্য আসা ফ্রাঙ্কেস্টাইন স্টাইলে ঘুষ লেনদেন—কী অভিযোগ নেই ঢাকা কাস্টম হাউসের বিরুদ্ধে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সবসময়ই এসব অভিযোগের বিষয়ে চোখে পর্দা দিয়ে নীরব ভূমিকায় ছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বারবার অনিয়ম হলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সর্বশেষ বাংলাদেশ কাস্টমসের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ চুরির ঘটনাটি ঘটেছে। আর সুরক্ষিত সে গুদাম থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে ৫৫ কেজি স্বর্ণ।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ আগস্ট হলেও বলা হচ্ছে ২ সেপ্টেম্বর। তবে দেরিতে হলেও এরই মধ্যে ফৌজদারি মামলা করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। মামলার পর ঢাকা কাস্টম হাউসের ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। চুরির ঘটনাকে পরিকল্পিত মনে করছে পুলিশ।
ঢাকা কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, গুদাম কর্মকর্তাদের বদলির পরই চুরির ঘটনা সামনে আসে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৬ মাস পর অভ্যন্তরীণ বদলি হয় এসব কর্মকর্তার। অনেক স্বর্ণ মিসিং বলেও নতুন কর্মকর্তারা এবার দায়িত্ব বুঝে নিতে রাজি ছিলেন না। তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেন। যদিও গত জানুয়ারি মাসে বদলির সময় হওয়া গুদাম কর্মকর্তারা সব পণ্য হাতে-কলমে ঠিকমতোই বুঝিয়ে দিয়ে যান।
আবার মামলার এজাহারে যেসব ডিএমের বিপরীতে ৫৫ কেজি স্বর্ণ গায়েব হয়েছে, সেসব পণ্য চলতি বছরের জুন থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে আসা বলা হয়েছে। কারণ ডিটেনশন মেমোর (ডিএম) মধ্যে সে তারিখ উল্লেখ আছে। তবে, অভিযোগ রয়েছে, ভয়াবহ এই চুরির ঘটনার পর প্রকৃত অপরাধী আড়াল করতে প্রাণপণ চেষ্টায় ঢাকা কাস্টম হাউসের ঊর্ধ্বতনরা। কিন্তু ধামাচাপা দিতে না পেরে গত শুক্রবার থেকে নতুন করে ইনভেন্ট্রি শুরুর পরিকল্পনা নেয় হাউস কর্তৃপক্ষ। তখনই বেরিয়ে আসে ৫৫ কেজি স্বর্ণভর্তি একটি লকার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে মামলার প্রস্তুতি নেয় ঢাকা কাস্টম হাউস। প্রিভেন্টিভের এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে দিয়ে মামলা করানো হয় বিমানবন্দর থানায়। শুধু তাই নয়, কাস্টম হাউসের আদেশে একজন অতিরিক্ত কমিশনারকে প্রধান করে নতুন করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গুদামের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের স্থায়ী আদেশে বলা আছে, সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউসের কমিশনার গুদামে একজন নিরীক্ষণ কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন। সেই কর্মকর্তা প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে গুদাম পরিদর্শন করে কমিশনারের কাছে প্রতিবেদন পাঠাবেন। আর কমিশনার গুদামের নিরাপত্তাসহ সার্বিক প্রতিবেদন ছয় মাস পরপর এনবিআরের পাঠাবেন। এ ছাড়া গুদামের চাবি ও লক-এন্ট্রি ঠিক আছে কি না তা দেখবেন তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা। দেহ তল্লাশি কর্মকর্তা হবেন কমিশনার কর্তৃক নিয়োগকৃত এবং পোশাকধারী। গুদামে যারা প্রবেশ করবেন তাদের দেহ তল্লাশি করবেন। আর তল্লাশি কর্মকর্তা চার শিফটে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন; কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, এ ধরনের কোনো নিয়মই মানা হয়নি ঢাকা কাস্টমসে।
তবে, বিষয়গুলো না মানার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বর্তমান কমিশনার একেএম নুরুল হুদা আজাদ। উল্টো তিনি কালবেলার কাছে দাবি করেন, অটোমেশনের জন্য কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার পর এই ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। যদিও গুদাম ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার সিস্টেম চালু করেছেন বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান। এখন সফটওয়্যারের মাধ্যমেই গুদামে স্বর্ণ সংরক্ষিত রাখা হয়। এ ছাড়া গায়েব হওয়া স্বর্ণ ২০২০ থেকে ২০২৩ সালে আসা। অথচ মামলার এজাহার এবং ডিএম অনুযায়ী এসব স্বর্ণ এসেছে চলতি বছরের অর্থাৎ ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে।
সূত্র আরও জানায়, ২০২০ সালের আগস্টে বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম ঢাকা কাস্টম হাউসে গুদাম ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার উদ্বোধন করেন। একই বছর সেপ্টেম্বরে থেকে এই সফটওয়্যার ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই থেকে অটোমেশনের মাধ্যমে চলছে গুদামের কার্যক্রম। আর সফটওয়্যার চালুর পর থেকে ম্যানুয়ালি অর্থাৎ হাতে লেখা ডিএম বাদ দেওয়া হয়। গুদামে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সফটওয়্যারে এন্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হয়। এত নিরাপত্তার পরও গায়েব হয়ে গেছে স্বর্ণ। যদিও পুলিশের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে গায়েব করা হয়েছে স্বর্ণ।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গুদাম থেকে স্বর্ণ চুরির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা আটজনের মধ্যে চারজনই ঢাকা কাস্টম হাউসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। তারা হলেন, মাসুম রানা, সাইদুল ইসলাম শাহেদ, শহিদুল ইসলাম ও আকরাম শেখ। বাকি চারজন সিপাহি। তারা হলেন রেজাউল করিম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, আফজাল হোসনে ও নিয়ামত হাওলাদার। চুরির অভিযোগে মামলা হলেও ঘটনাটি চুরি নয় বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারীরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার তৌহিদুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তের পর মনে হচ্ছে চুরি নয়, ভেতর থেকে পরিকল্পিতভাবে সরানো হয়েছে স্বর্ণ। তাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
মন্তব্য করুন