ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে পুরো ক্যাম্পাস এখন নির্বাচনী উচ্ছ্বাসে মুখর। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রচার শুরু করেছেন বিভিন্ন পদের প্রার্থীরা; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রয়েছে কঠোর অবস্থানে। ডাকসু নির্বাচনের এই ডামাডোলে নিয়মিত পড়াশোনা ও শিক্ষা কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়- সে বিষয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। ভোট গ্রহণের দিন সেনাবাহিনী থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে, বহিরাগতদের প্রবেশ থাকবে নিষিদ্ধ এবং কার্যত সিলগালা করা হবে পুরো ক্যাম্পাস। প্রার্থীদের আচরণবিধি মেনে চলারও নির্দেশনা দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রচারের উত্তাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি সতর্কতার আবহও বিরাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের নির্বাচন হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের। আগেভাগে জয়ী নির্ধারণ করা (পূর্বানুমান) কঠিন হলেও নারী ভোটার, অনাবাসিক শিক্ষার্থী ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের সমীকরণে পার্থক্য গড়ে দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪৭১ প্রার্থী এবারের ডাকসু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এর মধ্যে নারী ৬২ ও পুরুষ প্রার্থী ৪০৯ জন। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। তার মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০ হাজার ৮৭৩ জন এবং ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯০২ জন। এর মধ্যে মোট ভোটারের ৪১ শতাংশ অনাবাসিক শিক্ষার্থী। আর সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন প্রায় ১০ শতাংশ, সংখ্যায় যা প্রায় ৪ হাজার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিগত ডাকসু নির্বাচনেও নারী ভোটারদের ভোট যারা বেশি পেয়েছেন, তারাই জয়ী হয়েছেন। তার অন্যতম কারণ বেশিরভাগ নারী শিক্ষার্থীই যুক্ত নন রাজনীতির সঙ্গে। ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের নির্ধারিত ভোটের বাইরে এদের ভোট গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের ভোট টানতে প্রার্থীদের কাজ শুরু করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা, স্যানিটেশন, ক্যান্টিন-সুবিধা এবং অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিতে নারী ভোটারদের আকৃষ্টের চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। ছাত্রী ভোটারদের ভোট নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্যানেলেই ক্যাম্পাসের পরিচিত নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পদে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া জগন্নাথ হল এবং ছাত্রীদের পাঁচটি হলের প্রায় ৪ হাজার সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীও জয়-পরাজয়ের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ভোটের পাল্লা যেদিকে বেশি ঝুলবে তারাই অনেকটা এগিয়ে থাকবেন। অন্যদিকে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই অনাবাসিক ভোটার। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাননি। তাদেরও অনেকেই ছাত্র সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক আবহ থেকে থাকেন অনেকটাই দূরে। ডাকসুর গত নির্বাচনে তাদের ভোট বাক্সে পড়েছেও সবচেয়ে কম। তবে এবার বিশ্ববিদ্যালয় এসব শিক্ষার্থীর জন্য পরিবহন ব্যবস্থা করেছে, পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক আবহেও। এসব কারণে এবার অনাবাসিক এই শিক্ষার্থীদের ভোট বেশি পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের ভোট যারা বেশি টানতে পারবে তারা এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করা হচ্ছে। প্রার্থীরাও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস, লাইব্রেরি ও কমনরুমের সুবিধা বৃদ্ধি এবং টিউশন ফি কমানোর মতো প্রতিশ্রুতিগুলো ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অনাবাসিক শিক্ষার্থী সালেহ আহমেদ বলেন, ‘হলের প্রার্থী ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে খুব একটা জানা নেই। কেন্দ্রীয় সংসদেও এখন দেখছি কারা যোগ্য এবং যারা আমাদের বিভিন্ন সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেবে তাদের ভোট দিব।’
আরেক ভোটার ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে সালমা বলেন, ‘এবার নারী ভোটার এবং প্রার্থী দুটোই বেশি। আমরা চাইব নারী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসুক। প্রায় অর্ধেক নারী ভোটার হওয়ায় জয় অনেকটা তারাই নির্ধারণ করে দেবেন।’
ভোটের দিন অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে পৌঁছাতে বিশেষ ব্যবস্থার কথা জানান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী অনাবাসিক। তারা সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবহার করেন। ভোটের দিনে ট্রিপ বাড়ানো হবে। পাশাপাশি ডিএমপি কমিশনারকে অনুরোধ করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীবাহী যানবাহন চলাচলে সহায়তা করে।’
ডাকসুতে চূড়ান্ত প্রার্থী ৪৭১, বাদ ৩৮ জন: ডাকসু নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ৪৭১ জন। এর আগে, ৫০৯ জন খসড়া প্রার্থীর তালিকা দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই প্রার্থীদের মধ্যে ২৮ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। এ ছাড়া খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ১০ জন পুনরায় আপিল করেননি। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। এ বছর কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ২৮ পদে শিক্ষার্থীরা লড়ছেন। এর মধ্যে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৫ জন, জিএস পদে ১৯ জন ও এজিএস পদে ২৫ জন। নারী প্রার্থী ৬২ জনের মধ্যে ভিপি পদে ৫ জন, জিএস পদে একজন ও এজিএস পদে রয়েছেন ৪ জন।
নারীদের পাশাপাশি সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। ছাত্রদলের প্যানেলে রয়েছেন চাকমা, রায় ও পাল সম্প্রদায়ের প্রার্থী। এই প্যানেলে ক্রীড়া সম্পাদক পদে চিম চিম্যা চাকমা এবং সদস্য পদে রঞ্জন রায় ও নিত্যানন্দ পালকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটে’ রয়েছেন সর্ব মিত্র চাকমা; উমামার স্বতন্ত্র প্যানেলে সুর্মী চাকমা, রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা, ববি বিশ্বাস ও অর্ক বড়ুয়া। বামদের প্রতিরোধ পর্ষদে জিএস পদে মেঘমল্লার বসু, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে লিটন ত্রিপুরা এবং সদস্য পদে রয়েছেন পৃথিং মারমা ও হেমা চাকমা। এ ছাড়া জগন্নাথ হল থেকে ৫৯ জন এবং শামসুন নাহার হল থেকে ১১ জন প্রার্থী লড়ছেন, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী।
পুরোদমে প্রচারণা, সতর্কতা প্রশাসনের : বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে গতকাল এক সভায় চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরুর ঘোষণা দেন। এরপর ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ সমর্থিত প্যানেলসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচারণায় নেমে পড়েন। ক্যাম্পাসে তাদের জনসংযোগ করতে দেখা যায়। বিকেলে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল ভিসি চত্বরে ‘স্মৃতি চিরন্তন’- এ শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট জোহরের নামাজ শেষে ঢাবির কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে প্রচারণা শুরু করে। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ সমর্থিত ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্রচারণা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল পাড়া থেকে। বাম সমর্থিত ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে কার্যক্রম শুরু করে। একই সময়ে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে ফুল দিয়ে শুরু করে প্রচারণা।
স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে সেনাবাহিনী : আলোচিত এই নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোটের দিন সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মোতায়েন থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৮ তারিখ বিকেল থেকে ৯ তারিখ সারা দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রোস্টেশন বন্ধ থাকবে। ভোটের এক সপ্তাহ আগে থেকেই হলে বহিরাগত থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। শাহবাগ, দোয়েল চত্বর, বার্ন ইউনিট, শিববাড়ি ক্রসিং, ফুলার রোড, পলাশী মোড় ও নীলক্ষেত প্রবেশপথে সেনাসদস্যরা অবস্থান নেবেন। ভোট গণনার সময় কেন্দ্রও ঘিরে রাখবেন তারা।
গতকাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে প্রার্থীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের এক সভা হয়। এতে রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘ভোটের দিন তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। প্রথম স্তরে প্রক্টরিয়াল বডি ও বিএনসিসি, দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ এবং তৃতীয় স্তরে সেনাবাহিনী স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে। ভোট শেষে ব্যালট নিরাপত্তার দায়িত্বও নেবে তারা।’
সভায় রিটার্নিং অফিসার কাজী মারুফুল হক বলেন, ‘ডাকসু মূল কার্যক্রম নয়; পড়াশোনা যেন ব্যাহত না হয় তা কঠোরভাবে দেখা হবে।’
ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে প্রশাসন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মো. জসীম উদ্দিন।
গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘প্রার্থীর তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রচারণার কাজ শুরু হয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের দ্বন্দ্ব-বিবাদে জড়ানো যাবে না। পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা আমাদের অস্তিত্বের জন্যই দরকার হবে। যারা এই নির্বাচনে প্রার্থী এবং ভোটার সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অংশ। কেউ অগ্রজ, কেউ অনুজ এবং কেউ সতীর্থ।’
মন্তব্য করুন