চলতি মাসের শেষ ও জুলাইয়ের মধ্যভাগে একের পর এক বাংলাদেশ সফরে আসবেন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে বিদেশি এই কূটনীতিকদের ঢাকা সফরের সময় আলোচনায় প্রাধান্য পাবে জাতীয় নির্বাচন। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো এ তথ্য জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জুন ও জুলাই মাসে একের পর এক হাই-প্রোফাইল সফর নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। আগামী মাসের (জুলাই) মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নাগরিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জিয়া এবং অর্থনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জোসে ডব্লিউ ফার্নান্দেজ পৃথকভাবে ঢাকা সফর করবেন। এর আগে আগামী ২৫ জুন জাতিসংঘের পিস অপারেশন বিভাগে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে লাক্রুইক্স এবং ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি, পলিসি ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ক্যাথেরিন পোলার্ড দুদিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। এ ছাড়া জুলাইয়ে প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি দেখতে ইইউ পর্যবেক্ষক দলের ঢাকা সফরে পরিকল্পনা চলছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গা নিয়ে মার্কিন কর্মসূচি দেখতে উজরা জিয়ার বাংলাদেশে আসার কথা ছিল আগামী ১১ জুলাই। তবে তারিখ পরিবর্তন হচ্ছে। নতুন তারিখ জুলাইয়ের মধ্যভাগে রাখা এবং সফরের এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে দুদেশের কূটনৈতিক চ্যানেল। উজরা জিয়া বাংলাদেশ সফরের সময় কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের সরেজমিন দেখতে যাবেন বলে জানা গেছে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আন্তর্জাতিক তাগিদ বাড়ছে। অন্যান্য পশ্চিমা দেশ এখনো নীরব থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে নতুন ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে। দেশটির কংগ্রেসম্যানরাও নির্বাচন ইস্যুতে ভূমিকা রাখতে বাইডেন প্রশাসনকে আহ্বান জানাচ্ছেন। এমন বাস্তবতায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত কূটনীতিক উজরা জিয়ার বাংলাদেশ সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল। জানা গেছে, দিল্লি হয়ে ঢাকা সফরে আসবেন মার্কিন এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তার ফোকাস রোহিঙ্গা ইস্যু হলেও দুদেশের মধ্যে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, উজরা জিয়ার সফরকালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে ঢাকা। চীন-রাশিয়াসহ মার্কিন উদ্বেগগুলো এবং সরকার সম্পর্কে দেশি-বিদেশি অপপ্রচার নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা হবে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যেন দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায় সে ব্যাপারেও খোলামেলা আলোচনা করবে বাংলাদেশ।
সূত্র জানায়, উজরা জিয়ার সফরের পর মার্কিন অর্থনৈতিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জোসে ডব্লিউ ফার্নান্দেজের বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। তার সফরে দুই দেশ বাণিজ্য ও শ্রম ইস্যুতে গুরুত্ব দেবে। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তাসহ শ্রম খাতে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশি পণ্যের বড় রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র শ্রম আইন ও শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বরাবরই সরব। ফার্নান্দেজের সফরের সময় ঢাকায় দুদেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের অর্থনৈতিক সংলাপ হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সংলাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। সংলাপে শ্রম ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করা হবে।
এদিকে, ঢাকা ও নিউইয়র্কের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ, কানাডা ও উরুগুয়ের যৌথ আয়োজনে আগামী ২৫-২৬ জুন ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘শান্তিরক্ষা মিশনে নারী’ শীর্ষক দুদিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্মেলনে যোগ দিতে জাতিসংঘের পিস অপারেশন বিভাগে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যঁ পিয়েরে লাক্রুইক্স এবং ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি, পলিসি ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ক্যাথেরিন পোলার্ড দুদিনের সফরে বাংলাদেশে আসছেন। সফরের সময় সম্মেলনের পাশাপাশি তাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
জ্যঁ পিয়েরের সফরকে সামনে রেখে সম্প্রতি মার্কিন সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার বরাবর একটি খোলা বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী নিয়োগের আগে মানবাধিকার ইস্যুতে অতীত পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বভাবতই তার সফরের সময় ইস্যুটি নিয়ে আলোচনা হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো।
এ ছাড়া জুলাই মাসে বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ব পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশে একটি পর্যবেক্ষক প্রতিনিধিদল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ব্রাসেলস ও ঢাকা জুলাই মাসে এই প্রতিনিধিদলের সম্ভাব্য সফর নিয়ে কাজ করছে।
এদিকে, আজারবাইজানের বাকুতে আগামী ৫-৬ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। এ বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
মন্তব্য করুন