মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৩, ০১:৪৮ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ভুল চিকিৎসার দায় কার

বাড়ছে অভিযোগ
ভুল চিকিৎসার দায় কার

রাজধানীর শনির আখড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আলেফা খাতুন। উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ১৫ মে বাথরুমে পড়ে গিয়ে বাঁ পায়ে আঘাত পান। এরপর রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকের পরামর্শে ফিমেল অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডের ৮ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়।

১৪ দিন অপেক্ষার পর হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ও অর্থোপেডিক সার্জন ডা. জাকির হোসেনের তত্ত্বাবধানে ভাঙা পায়ের অপারেশনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। গত ২৯ মে অপারেশন শেষে রোগীর জ্ঞান ফিরলে দেখা যায়, ভাঙা পা রেখে ভালো পায়ের অপারেশন করেছেন চিকিৎসক!

বাঁ পা রেখে ওই চিকিৎসক রোগীর ডান পায়ের অপারেশন করেন। এতে সুস্থ পা অচল হয়ে পড়ে। দুই পায়ের ভোগান্তি নিয়ে এখন শয্যাশায়ী ষাটোর্ধ্ব আলেফা খাতুন। আজ সোমবার সকালে তার ভাঙা পায়ে ফের অপারেশন করা হবে।

এই ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসকের গাফিলতি নিয়ে হাসপাতালের পরিচালক বরারব একটি লিখিত অভিযোগও করেছেন আলেফার স্বজনরা। কালবেলার হাতে তার একটি অনুলিপি এসেছে।

অভিযোগে বলা হয়, ভাঙা পায়ের পরিবর্তে তার মায়ের ভালো পায়ে অপারেশন করে চিকিৎসক কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

রোগীর ছেলে আরমান আহমেদ কালবেলাকে বলেন, আমার মায়ের বাঁ পা ভেঙেছে। সেখানে ভাঙা পায়ের পরিবর্তে চিকিৎসক ডান পায়ের অপারেশন করেছেন। এতে ক্ষতি হয়েছে দুটি পায়েরই। ভাঙা পা ভাঙা থেকে গেছে। ভালো পায়ে অপারেশনের কারণে মায়ের হাঁটাচলা এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লিখিত অভিযোগের পর আমরা থানায় মামলা করতে চেয়েছিলাম। হাসপাতালের পরিচালক মায়ের সব ধরনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। অভিযুক্ত চিকিৎসকদের শাস্তির আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন। তাই মামলা করিনি। তবে হতাশ হয়েছি। রাজধানীর মতো জায়গায় একটি বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই দশা হলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কতটুকু আস্থা রাখা যায়?

অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার কল করা হলেও অর্থোপেডিক সার্জন ডা. জাকির হোসেন রিসিভ করেননি। তবে অভিযোগ স্বীকার করেছেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নিয়াতুজ্জামান।

তিনি কালবেলাকে বলেন, ভাঙা পা রেখে ভালো পায়ে অপারেশনের অভিযোগ পেয়েছি। তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই সপ্তাহে তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাব। এরপর অভিযুক্তদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা বরাবরই রোগীদের শতভাগ নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর।

এখানেই শেষ নয়। গত আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে অবশেষে হেরে গেলেন কুমিল্লার মাহবুবা রহমান আঁখি। সোশ্যাল মিডিয়ায় গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সংযুক্তা সাহার চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে স্বাভাবিক প্রসবের স্বপ্ন নিয়ে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল হসপিটালে এসেছিলেন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার ইয়াকুব আলী সুমন-আঁখি দম্পতি।

প্রসব ব্যথা ওঠায় গত শুক্রবার (৯ জুন) রাত ১২টা ৫০ মিনিটে সেন্ট্রাল হসপিটালে ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে ভর্তি করা হয় আঁখিকে। তখন ডা. সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে ছিলেন না। জানা গেছে, তিন মাস ধরে ডা. সংযুক্তা সাহার অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাহবুবা রহমান আঁখি। তার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলে চিকিৎসক জানিয়েছিলেন।

নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমেই সন্তান প্রসব সম্ভব বলে তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ডা. সংযুক্তা সাহা। শুক্রবার রাতভর চলে স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা। একপর্যায়ে ভোর রাতে সিজার করতে গিয়ে অনভিজ্ঞ চিকিৎসক আঁখির মূত্রনালি ও মলদ্বার কেটে ফেলেন। পরে প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাকে ল্যাবএইডের সিসিইউতে ভর্তি করা হয়।

এদিকে সুমন-আঁখি দম্পতির নবজাতক সেন্ট্রাল হাসপাতালে জন্মের আধ ঘণ্টার মধ্যে মারা যায়। এরপর ১০ জুন থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত আঁখির জ্ঞান ফিরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত গতকাল দুপুরে ল্যাবএইডে আঁখি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যেই স্বামী প্রসূতি স্ত্রীকে নিয়ে কুমিল্লা থেকে নিরাপদ প্রসবের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন, তার ঘাড়ে এখন স্ত্রী ও নবজাতকের লাশ।

এ বিষয়ে আঁখির স্বামী ইয়াকুব আলী বলেন, আমার স্ত্রীকে যখন ওটিতে ঢোকানো হয় এবং নরমাল ডেলিভারির জন্য চেষ্টা শুরু করা হয়, তখনো আমি সংযুক্তা সাহা হাসপাতালে আছেন কি না জানতে চাই। কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনি আছেন এবং তিনি চেষ্টা চালাচ্ছেন। পরে জানতে পেরেছি ডা. সংযুক্তা সাহা ছিলেন না এবং তারা রোগীর কোনো রকম চেকআপ ছাড়াই ডেলিভারির কাজ শুরু করে দেন। এরপর যা হয়েছে আপনারা তো সবই জেনেছেন। আমার স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমি এই হত্যার বিচার চাই। আর কারও সঙ্গে চিকিৎসার নামে এই অন্যায় যেন না হয়।

এদিকে, এ ঘটনায় গত বুধবার ধানমন্ডি থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর একটি মামলা করেন ইয়াকুব আলী। মামলায় ডা. শাহজাদী মুস্তার্শিদা সুলতানা, ডা. মুনা সাহা, ডা. মিলি, সহকারী জমির, এহসান ও হাসপাতালের ম্যানেজার পারভেজকে আসামি করা হয়। এ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলার পর ১৫ জুন রাতে ডা. শাহজাদী ও ডা. মুনা সাহাকে হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

এর আগে গত ৬ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে নূরুন নাহার নামের এক গৃহিণী অভিযোগ করে বলেন, রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে অনৈতিক রিং বাণিজ্য ও ভুল চিকিৎসায় তার স্বামী জাকির হোসেনের মৃত্যু হয়। অপচিকিৎসার দায় ওঠে হাসপাতালের দায়িত্বরত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম আজম, ডা. শেখর কুমার মণ্ডল ও ডা. রাশেদুল হাসান কনকের বিরুদ্ধে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি করেছে ভুক্তভোগীর পরিবার। বিএমডিসি সূত্র জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাসে বাদী ও বিবাদী উভয়কে বিএমডিসিতে শুনানির জন্য ডাকা হবে।

বিএমডিসিতে অভিযোগে সাধারণ মানুষের অনীহা:

সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার এক স্বজনহারা পরিবার কালবেলার সঙ্গে যোগাযোগ করে। রাজধানীর মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. হরিদাস সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ওই পরিবারের এক সদস্য বলেন, তার মায়ের পেটের প্রদাহজনিত রোগের অপারেশন করতে গিয়ে খাদ্যনালি কেটে ফেলা হয়েছে। পরে তার মৃত্যু হয়। তার মায়ের মৃত্যুর পর এসব নিয়ে কোনো অভিযোগ করা যাবে না এবং কোনো ক্ষতিপূরণ চাওয়া যাবে না—এই মর্মে রোগীর সব কাগজপত্র রেখে দিয়ে লাশের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

কিন্তু আঁখির ভুল চিকিৎসার বিষয়ে আলোচনা উঠলে তারাও ওই হত্যার বিচার চান। তবে বিএমডিসিতে অভিযোগের বিষয়ে তাদের কোনো আস্থা নেই। ওই নারীর ছেলে রাজু কালবেলাকে বলেন, বিএমডিসিতে অভিযোগ করে কি লাভ? এখানে তো কোনো সমাধান হয় না।

কোনো চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএমডিসিতে অভিযোগ করা যায়। বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ধারা-২৩ অনুসারে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত চিকিৎসকের নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা রয়েছে। আরও কিছু আইনে চিকিৎসা ও ওষুধ সংক্রান্ত অপরাধের প্রতিকারের বিধান আছে যেমন: ড্রাগস অ্যাক্ট, ফার্মেসি অর্ডিন্যান্স, ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক প্র্যাকটিশনার্স অর্ডিন্যান্স, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন ১৯৯৯, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন আইন রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) তথ্য মতে, গত আড়াই বছরের অভিযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের গত ছয় মাসে মাত্র ৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। গত বছর ৩০টি এবং এর আগের বছর মাত্র ৩২টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটির অপর এক তথ্যমতে, ২০১০ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে গত বছর ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ২৬৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। তার মধ্যে মাত্র ৩৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট যাচাই চলছে ৫০টির, আর ২৮ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একজনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়েছে। ১২টি রেজিস্ট্রেশন বিভিন্ন মেয়াদে স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও অনেক মামলা চিঠিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করে সমাধান করা হয়েছে এবং অনেক মামলা আমলে নেওয়া হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির কালবেলাকে বলেন, দেশের বৃহৎ হাসপাতালে চিকিৎসার নামে প্রতারণা কিংবা ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় বিপর্যয়। এতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে। সামর্থ্যবানদের মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে। এসব অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত আমরা তাদের দ্রুত শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব।

বিএমডিসির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. লিয়াকত হোসেন কালবেলাকে বলেন, সেন্ট্রাল হসপিটালে প্রসূতি নারীর সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়ে আমাদের কাছে এখনো অফিসিয়াল কোনো কমপ্লেইন আসেনি। কেউ যদি বিএমডিসিতে অভিযোগ করে আমরা তাদের বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমরা আমাদের মতো করে বাঁচি: নুসরাত জাহান

দিনে কখন ও কয়টি কাঠবাদাম খেলে সবচেয়ে বেশি উপকার

লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জন আদালতে

বদলে গেল মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ-নাঈম শেখদের দল

ঘুম হারিয়েছেন সিদ্ধার্থ

আজ ঢাকার বাতাস সহনীয়, দূষণের শীর্ষে দোহা

কারাগার থেকে বেরিয়ে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে যুবক খুন

মহড়ার সময় এফ-১৬ বিধ্বস্ত, বেঁচে নেই পাইলট

অনেক কিছুই নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে : বিসিবি সভাপতি

আফ্রিদিকে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য বেরিয়ে আসছে

১০

ডায়াবেটিসের কিছু আশ্চর্যজনক লক্ষণ, যা জানেন না অনেকেই

১১

বহিরাগতদের দখলে ঠাকুরগাঁওয়ের ভূমি অফিস, ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা

১২

নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই সাকিব-মাশরাফির

১৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শ্মশানের জায়গা দখলমুক্ত করার দাবি

১৪

তিন সন্তানকে বাথটাবে হত্যার পর আত্মহত্যার চেষ্টা নারীর

১৫

আইন ও বিচার বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পেলেন লিয়াকত আলী মোল্লা

১৬

বিনোদন পার্কে হামলা-ভাঙচুর, দরবার শরিফে আগুন

১৭

গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন পদে চাকরির সুযোগ, এসএসসি পাসেও আবেদন

১৮

ইরানকে চাপে ফেলতে ইইউ ত্রয়ীর নতুন সিদ্ধান্ত

১৯

ডিজিটাল মোবাইল জার্নালিজম ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট করছে : উমামা ফাতেমা 

২০
X