

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং নিহতের স্ত্রীর করা মামলার সূত্র ধরে তদন্তকারীরা এ হত্যাকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন।
বুধবার রাতে কারওয়ান বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে ওতপেতে থাকা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন মুসাব্বির। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তেজগাঁও থানায় ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বুধবার রাতে কারওয়ান বাজারের সুপারস্টার হোটেলের দ্বিতীয় তলায় প্রতিদিনের মতো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন মুসাব্বির। আড্ডা শেষে ৮টা ১০ মিনিটে সুফিয়ান বেপারি মাসুদকে নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। তারা ৮টা ২০ মিনিটে তেজতুরী বাজারে আহসানউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সামনের রাস্তায় পৌঁছালে ওতপেতে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় ৪-৫ জন তাদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তাতে মুসাব্বিরের ডান হাতের কনুই ও পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। রক্তাক্ত জখম নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে বাঁচাতে মাসুদ এগিয়ে গেলে তাকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করে হামলাকারীরা। মাসুদও রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা তাদের মৃত ভেবে গুলি করতে করতে পালিয়ে যায়।
মামলা করার পর সুরাইয়া বেগম সংবাদমাধ্যমকে বলেন, স্বামীর সঙ্গে শেষবার কথা হয় সন্ধ্যায়। তিনি আমাকে বললেন তুমি একটা কফি বানিয়ে দাও, আমি নামাজ পড়ে বের হবো। ওইটাই শেষ কথা ছিল। তিনি যখন বাইরে যান প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বাসায় ফোন দেন না।
হত্যার বিচার দাবি করে সুরাইয়া বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ রয়েছে। এসব দেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জরুরি পদক্ষেপ নেবে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। আগেও ঘটেছে, এখনো ঘটছে, ভবিষ্যতেও হয়তো ঘটবে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে আমার মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।
হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে থেকেই মুসাব্বিরকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল জানিয়ে সুরাইয়া বলেন, ২০ বছর ধরে পানির ব্যবসা করে আসছিলেন মুসাব্বির। প্রথমে সরাসরি জড়িত থাকলেও রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর লোক দিয়ে এই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ব্যবসা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকার কথা না।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ফুটেজে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই দুর্বৃত্ত। মুসাব্বিরকে দেখামাত্র তারা বস্তার ভেতর থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করেন। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মুসাব্বির। কিছুক্ষণ পর উঠে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই দ্রুত পালিয়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রথমে মুসাব্বিরকে লক্ষ্য করে একটি গুলি করা হলে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর তিনি একটি গলির ভেতরে ঢুকে পড়েন; কিন্তু সেখানে বের হওয়ার পথ না থাকায় বের হয়ে অন্য গলিতে ঢোকার চেষ্টা করেন। তখন তাকে আরেক দফা গুলি করা হয়। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই হত্যাকারীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, হত্যাকারীরা ঘটনার অনেক আগেই ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। মুসাব্বির পরিচিতদের সঙ্গে সেখানে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সুযোগ বুঝেই তারা হামলা চালায়। এ হামলায় কারওয়ান বাজার ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুফিয়ান বেপারি মাসুদও গুলিবিদ্ধ হন। পাঁজরে গুলি লাগা অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, বর্তমানে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন।
তেজগাঁও থানার ওসি কৈশন্যু মারমা বলেন, হত্যা মামলা করা হয়েছে। আসামিদের ধরতে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দুজনের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। একজনের চেহারা আংশিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারলেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অনেকটাই অগ্রগতি হবে। শনাক্ত করতে থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
নয়াপল্টনে মুসাব্বিরের জানাজা সম্পন্ন: ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের জানাজা গতকাল বাদ জোহর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব রবিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এস এম জাহাঙ্গীর, যুববিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফ আলী শফু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলীসহ যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার দাবি স্বেচ্ছাসেবক দলের: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুসাব্বিরের নামাজে জানাজার আগে স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াসিন আলী ও সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল শনিবার ঢাকা মহানগরসহ সারা দেশের মহানগর ও জেলায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা না হলে স্বেচ্ছাসেবক দল কঠোর কর্মসূচি দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন নেতারা।
মন্তব্য করুন