কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

তেলের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে ট্রাম্পের হাতে কী আছে ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে

তেল বাজারজাতকরণ ও বিক্রি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করবে যুক্তরাষ্ট্র
তেলের নিয়ন্ত্রণ যাচ্ছে ট্রাম্পের হাতে কী আছে ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে

ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর এবার দেশটির বিশাল তেলসম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বিপুল পরিমাণ তেলের নিয়ন্ত্রণ এখন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের কম্পন সৃষ্টি করেছে।

ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে এক চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন এখন দেশটির প্রায় ৩ কোটি থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেলের বাজারজাতকরণ ও বিক্রির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নেবে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই তেল বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হবে এবং তা ভেনেজুয়েলার জনগণের কল্যাণে ও দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় ব্যয় করা হবে। তবে সমালোচকরা একে ভেনেজুয়েলার সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘একচ্ছত্র আধিপত্য’ হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা সফল হলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান গ্রাহক ছিল, তারা বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল মজুতকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির উৎপাদন ক্ষমতা বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলের মতো তেল উৎপাদন করছে, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনেজুয়েলার তেলের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আবির্ভূত হতে চায়। মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই কৌশলটি কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং অত্যন্ত বাণিজ্যিকও বটে। মার্কিন রিফাইনারিগুলো মূলত ভেনেজুয়েলার উৎপাদিত ‘ভারী অপরিশোধিত’ তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য উপযুক্ত। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের তেলের জন্য কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর নির্ভরশীল। যদি ভেনেজুয়েলার তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আসা শুরু করে, তবে তা মেক্সিকো ও কানাডার রপ্তানি বাজারেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। এরই মধ্যে ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্ত ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের বন্ধু দেশগুলোর জন্য একটি বড় ধাক্কা। ভেনেজুয়েলার সিংহভাগ তেল বর্তমানে চীনে রপ্তানি হয়, যার মাধ্যমে দেশটি তার ঋণ পরিশোধ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সরাসরি হস্তক্ষেপের ফলে চীন এখন তার অন্যতম সস্তা তেলের উৎস হারাতে পারে। বেইজিং এরই মধ্যে এ পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ এবং ‘দাদাগিরি’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া, ইরান ও কিউবা, যারা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত, তারাও এই পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তবে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের আলোচনা এখনো চলমান। তারা এই প্রক্রিয়াকে শেভরনের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেছে। হোয়াইট হাউস বলছে, তারা ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, যাতে তেল উৎপাদন বাড়ানো যায় এবং সেই অর্থ দিয়ে ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর বিদ্যুৎ খাত ও অবকাঠামো মেরামত করা সম্ভব হয়; কিন্তু মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ একে ‘উন্মাদনা’ এবং ‘বন্দুকের মুখে তেল চুরি’ হিসেবে অভিহিত করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

আগামী শুক্রবার মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর প্রধানদের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে কয়েক বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের রূপরেখা তৈরি হতে পারে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অবকাঠামোর বেহাল দশার কারণে বড় কোম্পানিগুলো সেখানে বড় বিনিয়োগ করতে কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। শেষ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ দেশটির সাধারণ মানুষের ভাগ্য ফেরাবে, নাকি তা কেবল মার্কিন স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনার দোলাচলে বন্দি। মার্কিন নিয়ন্ত্রণে তেল বিক্রির অর্থ যদি সরাসরি দেশটির ভেঙে পড়া বিদ্যুৎ খাত, চিকিৎসা এবং খাদ্য সরবরাহে ব্যয় হয়, তবে সাধারণ ভেনেজুয়েলানদের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকটের অবসান ঘটতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারকো রুবিও ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অর্থ সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে যাতে কোনো দুর্নীতিবাজ পক্ষ এর ভাগ না পায়। তবে অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার ভাগ্যে নতুন এক ‘অর্থনৈতিক পরাধীনতা’র ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজেদের অমূল্য সম্পদের ওপর থেকে সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশটি এখন পুরোপুরি ওয়াশিংটনের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যদি মার্কিন প্রশাসন এই তেলের রাজস্বকে কেবল রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ ছাড়া, চীন ও রাশিয়ার মতো দীর্ঘদিনের মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে একঘরে হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের এই ‘অনির্দিষ্টকালের’ নিয়ন্ত্রণ ভেনেজুয়েলাকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাবে, নাকি আধুনিক বিশ্বের এক নতুন কলোনি বা আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত করবে, তা কেবল সময়ের ব্যবধানেই পরিষ্কার হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ভেনেজুয়েলায় ১০০ জন নিহতের দাবি: ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো বুধবার রাতে জানিয়েছেন, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা ও তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছে। এর আগে কারাকাস নিহত মানুষের কোনো সংখ্যা জানায়নি। তবে ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী তাদের নিহত ২৩ সদস্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মাদুরোর নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বড় অংশকে ‘ঠান্ডা মাথায়’ হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে কিউবা জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলায় অবস্থানরত তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মধ্যেও কেউ কেউ নিহত হয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডের কমান্ডার বরখাস্ত: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্সিয়াল অনার গার্ডের জেনারেল ইন কমান্ডার জাভিয়ের মারকানো তাবাতাকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর তাবাতাকে বরখাস্ত করা হলো। নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী এখন নিউইয়র্কের একটি বন্দিশিবিরে রয়েছেন। সেখানে মাদক পাচারসহ কয়েকটি অভিযোগে এ দম্পতির বিচার শুরু হয়েছে।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ, হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ: ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর কলম্বিয়ার বিরুদ্ধেও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। তবে হুমকি দেওয়ার কয়েকদিন পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে পেত্রোকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণও জানিয়েছেন তিনি।

বুধবার দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপের পর ট্রাম্প জানান, হোয়াইট হাউসে পেত্রোর সফরের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর সঙ্গে কথা বলা ছিল বিরাট সম্মানের। তিনি মাদক পরিস্থিতি ও অন্য যে বিষয়গুলোতে আমাদের মধ্যে মতভেদ আছে সেগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য ফোন করেছিলেন। আমি তার ফোন কল ও যেভাবে তিনি কথা বলেছেন তার প্রশংসা করি। আর নিকট ভবিষ্যতে তার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।’ সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, ডয়চে ভেলে ও আলজাজিরা।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রতিপক্ষকে ১০ গোল দেওয়ার ম্যাচে যে রেকর্ড গড়লেন পেপ গার্দিওলা

স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন / সম্ভাব্য ইরান হামলা নিয়ে ‘প্রাথমিক’ আলোচনা করেছে ওয়াশিংটন

তামিম বিতর্কে অবস্থান পরিষ্কার করল কোয়াব

কিউই সিরিজের আগে ভারতীয় শিবিরে দুঃসংবাদ

আরেকবার চেষ্টা করে দেখি : মাহফুজ আলম

১১ জানুয়ারি : আজকের নামাজের সময়সূচি

বরিশালে ভ্যানচালককে কুপিয়ে হত্যা

৯ ঘণ্টা পর আইন বিভাগের সেই শিক্ষককে ছাড়ল চবি প্রশাসন

জমি নিয়ে বিরোধে ধস্তাধস্তি, একজনের মৃত্যু

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দুপক্ষের সংঘর্ষ, গুলিতে নিহত ১

১০

পাকিস্তানে বোমা বিস্ফোরণে জমিয়ত নেতা নিহত

১১

প্রথম দিনে প্রার্থিতা ফিরে পেলেন ৫১, হারালেন ১ জন

১২

সুসংবাদ পেলেন বিএনপির আরও দুই নেতা

১৩

খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনায় আইইবির দোয়া ও শীতবস্ত্র বিতরণ

১৪

সিমেন্ট কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে দগ্ধ ৮

১৫

কোনো দুষ্কৃতিকারী বিএনপি করতে পারবে না : রবিউল আলম

১৬

রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির বকুলতলায় স্পাইনাল কর্ড ইনজুরিদের নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন

১৭

আ.লীগের মতোই জঘন্য কাজ করছে জামায়াত : কায়কোবাদ

১৮

কবিতা মানুষের মনে সৌন্দর্য, অনুভূতি ও ভাবনা নিয়ে আসে : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

১৯

খালেদা জিয়া ছিলেন জাতীয়তাবাদী শক্তির আদর্শ : পিএনপি

২০
X