

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যেন বিশ্বব্যবস্থা একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে। বিশ্ব রাজনীতির ঘড়ির কাঁটা যেন নতুন করে ঘুরতে শুরু করেছে। ওয়াশিংটনের বদলে ক্রমেই আলো ছড়াচ্ছে বেইজিং। হোয়াইট হাউসের চেয়ে ঝংননহাই বা গ্রেট হল অব পিপলসে বেশি আলোক ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই শত্রু-মিত্র নির্বিচারে শুল্ক-ঝড় বইয়ে দেন। মিত্রদের ভূমি দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। তার আগ্রাসী নীতির কারণে মিত্ররা দ্রুত দূরে সরতে থাকেন। ইউরোপের পরীক্ষিত সহযোগীদেরও কাঠগড়ায় তোলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাই শীর্ষ নেতারা বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার নেতা চীনের শি জিনপিংয়ের দরবারে ঘন ঘন হাজিরা দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট, ফরাসি প্রেসিডেন্ট, কানাডার প্রধানমন্ত্রী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে যাননি বেইজিংয়ে! চলতি সপ্তাহে যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। আসলে এসব সফর কাকতাল নয়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব সফরের পেছনে রয়েছে এক গভীর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা—ট্রাম্পের নীতির ফলে বিশ্ব নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, চীন তা দ্রুত পূরণ করছে। ট্রাম্পের ক্ষমতায়ন এবং চীনের দ্রুত উত্থানের বিস্তারিত জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবির
বিশ্ব রাজনীতির গতিপথে গত বছরটা ছিল অস্বাভাবিক, অকার্যকর এবং অপ্রত্যাশিত মোড় নেওয়া এক প্রধান অধ্যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আন্তর্জাতিক কূটনীতির কাঠামো বদলে গেছে; বহু দেশই এখন পূর্বে বা পশ্চিমে দুটি শক্তিধরের মধ্যে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীন এরই মধ্যে একটি কেন্দ্রশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আর এর জোরালো প্রমাণ আমরা পাচ্ছি যখন একের পর এক বিশ্বনেতা বেইজিং সফর করছেন বা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ককে।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ থেকে ‘আমেরিকা একা’
ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ভুল সুফল অনেকটাই চীনের পক্ষে কাজে দিয়েছে, ফলস্বরূপ বেইজিং এখন শুধু অর্থনৈতিক অঞ্চলই নয়—কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবেও বিশ্বনেতাদের আকর্ষণ করছে।
আন্তর্জাতিক শূন্যতা: চীনের পক্ষে সুযোগ
ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট হয়ে ফিরে আসেন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে, তখন তার নীতির মূল কাঠামো ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’—অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় চুক্তির তুলনায় একতরফা পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এই চিন্তাধারা আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ঐতিহ্যবাহী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং সেই শূন্যতা চীন দ্রুত পূর্ণ করছে।
ট্রাম্পের বহুপক্ষীয় নীতি থেকে সরে যাওয়া, আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে পিছিয়ে পড়া এবং বাণিজ্য ব্যবস্থায় একতরফা সিদ্ধান্তগুলো অনেক মিত্র দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে বিশ্ব রাজনীতির দৃশ্যে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে—এ সেই শূন্যতা, যা চীনকে বিশ্ব নেতৃত্বের এক বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে।
চীনের বিশাল অর্থনীতি, বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত শিল্পে অগ্রগতি—এসব মিলিয়ে এখন বেইজিংতে বিশ্বনেতাদের আগমন এক কূটনৈতিক আকর্ষণ হিসেবেও কাজ করছে।
বেড়েছে শীর্ষ নেতাদের বেইজিং সফর
চীনে যাওয়ার পেছনে বিশ্বনেতাদের ব্যক্তিগত বা দেশীয় আগ্রহ সত্যিই একাধিক মাত্রায়—কেবল বাণিজ্য নয় কৌশলগত স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সমঝোতা বা মহাদেশীয় সমন্বয়ের প্রয়োজনে; তারা বেইজিংকে কেন্দ্র করে কৌশল সাজাচ্ছেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফর এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়, এটি একটি কৌশলগত শক্তির মিত্রতা—বিশেষ করে ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্বে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা নীতির পরিপ্রেক্ষিতে।
পুতিন বারবার বলেছেন রাশিয়া-চীনের সম্পর্ক বিশ্ব স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এবং দুই দেশ যৌথভাবে বহুপক্ষীয় উদ্যোগে যুক্ত হওয়া বা পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
এটি শুধু কূটনৈতিক সহযোগিতা নয়—এটি একটি শক্তির বার্তা, যেখানে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা পদক্ষেপকে সামনে নিয়ে রাশিয়া ও চীন নিজেদের বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বেইজিং সফর এক গুরুত্বপূর্ণ সীদ্ধান্ত। ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার পর অন্তত চারবার বেইজিং সফর করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তিনি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, জলবায়ু এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের বিষয়ে সমঝোতা এবং সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন।
মাখোঁ তার সফরে বিশ্ব সংকট—বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাণিজ্যের পরিবেশ—সহ নানা ইস্যুতে চীনকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এর পাশাপাশি পণ্য, প্রযুক্তি ও গ্লোবাল বাজারে যোগসূত্র বিষয়েও দলীয় আলোচনা হয়, যার মধ্যে বাণিজ্য ও শ্রম বাজারে বৈচিত্র্য খুঁজে পেতে চীন-ফ্রান্স সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ধরনের সফর ইউরোপের ঔপনিবেশিক বা পশ্চিমা কেন্দ্রিক ধাঁচ থেকে কিছুটা দূরে এসে দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা—এটাই বোঝায়।
সম্প্রতি চীন সফর করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তার এ সফরকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে ধরা হচ্ছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আর চলতি সপ্তাহে বেইজিং যাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তার বেইজিং সফর আন্তর্জাতিক খবরগুলোর শীর্ষ অগ্রাধিকার পাচ্ছে—এটি হবে দীর্ঘদিনের মধ্যে প্রথম ব্রিটিশ শীর্ষ নেতার চীন সফর। রয়টার্স অনুসারে, বেইজিং ও লন্ডনের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বিষয়ে সমঝোতা হওয়ার পাশাপাশি বাজার সংযোগ, সেবা খাত, সবুজ প্রযুক্তি পরামর্শ এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে—চীন যোগাযোগকে উন্নত করার লক্ষ্য নিয়ে।
ট্রাম্পের ভূমিকা
ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমেরিকার লক্ষ্য ছিল চীনকে অর্থনৈতিকভাবে একটি ধাক্কা দিয়ে চাপে ফেলা। তবে ফল হয়েছে উল্টোটা। বাজার ও বাণিজ্য নীতিতে বেইজিংয়ের স্থায়ী শক্তি, কম উৎপাদন খরচ, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং বিপুল অর্থনৈতিক পরিধি—এসব ট্রাম্পের সহায়তা না চাইলেও চীনের পক্ষে লাভের কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন, ট্রাম্পের একতরফা নীতি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে সরে যাওয়ার ফলে বিশ্বনেতারা এমন একটি সহায়ক শক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, যেটা পূর্বে ছিল মূলত অর্থনৈতিক অংশীদার—এখন তা চালক কূটনৈতিক কেন্দ্রেও পরিণত হচ্ছে।
চীনের দাওয়াত, শিল্পের আকর্ষণ, বড় বাজার এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা—এসব মিলিয়ে অনেক দেশই এখন চীনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ধাপে বিবেচনা করছে। এটি শুধু অর্থের খেলাই নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে অভিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনকে শক্ত করার দিকেও ইঙ্গিত করছে।
বহু ধারার বিশ্ব
ট্রাম্পের নীতি বিশ্বকে একটি দ্বিচরিত্র ভৌগোলিক শক্তি বিভাগে রাখতে চেয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে তা এমন এক বাস্তবে ঢুকিয়ে দিয়েছে যেখানে চীন একটি সক্রিয় বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। বেইজিং এখন কেবল দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার নয়—বিশ্ব কূটনীতি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের এক কেন্দ্র। এই পরিবর্তনের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক বেইজিং সফরগুলো, কেবল ব্যক্তিগত সফর নয় বরং তা বিশ্ব রাজনীতির নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। এ বাস্তবতার দিকে এখন চোখ রাখা প্রয়োজন—কারণ বৈশ্বিক শক্তি ক্রমেই একদিকে দু’ধ্রুব থেকে বহু ধ্রুব পর্যায়ে পরিবর্তিত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন