

বিশ্ব রাজনীতি একসময় পশ্চিমা মহাশক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো। তবে সম্প্রতি বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’র কারণে আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও শক্তির ভারসাম্য নতুন দিকে মোড় নিয়েছে। এ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে চীন এখন শুধু অর্থনৈতিক শক্তি নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবেও বিশ্বনেতাদের আকর্ষণ করছে। আর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উঠে এসেছেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। তিনি প্রায় ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যের কথা বলছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে এসসিও সম্মেলনে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে আহ্বান জানিয়েছেন শি জিনপিং। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানদের নিয়ে তিনি বলেন—‘আমরা চাই বিশ্ব সমান ও সুসংগঠিতভাবে বহুমুখী হোক, সব দেশের জন্য খোলা অর্থনীতি হোক এবং ন্যায়সংগত ও সমতার ভিত্তিতে বিশ্ব শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠুক।’
তিনি একই সঙ্গে নতুন একটি বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৃহত্তম এই শীর্ষ সম্মেলনকে আন্তর্জাতিক শাসন নিয়ে একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করছে চীন।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অনিশ্চিত নীতি, তাদের বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলো থেকে সরে আসা এবং ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেওয়ার মাঝেই এ সম্মেলন আয়োজিত হয়েছে। এতে শির উত্থান, অর্থনৈতিক দৃঢ়তা ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কৌশল বেইজিংকে নিয়ে যাচ্ছে নেতৃত্বের আসনে। যে কারণে বিশ্বনেতারা বারবার চীন সফর করছেন। প্রতিটি সফরই কেবল সৌজন্য নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত উদ্দেশ্য বহন করছে।
শির নেতৃত্বে চীন শুধু অর্থনৈতিক মহাশক্তি নয়, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও দ্রুত বাড়িয়েছে। তার যেসব উদ্যোগ তাকে নেতৃত্বের আসনে নিয়ে আসছে, তার অন্যতম হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)। বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো ও বিনিয়োগে চীনের প্রভাব বিস্তৃত করছে এ প্রকল্পের মাধ্যমে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কূটনীতির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় চীনের কৌশলগত উপস্থিতি ব্যাপকহারে বেড়েছে। এতে পশ্চিমাকেন্দ্রিক বিশ্ববিন্যাস ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। শি জিনপিং চীনের নেতৃত্বে নতুন বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্ব গঠনের চেষ্টা চলছে। ইউরোপ, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য শক্তিধর দেশের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করছে। চীনকে কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রযুক্তিতে অগ্রগতি—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফাইভজি, সবুজ শক্তি—চীনের ক্ষমতাকে বৈশ্বিক প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শি জিনপিং নতুন বিশ্বব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তবে তিনি একাই নতুন বিশ্বশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন না; তিনি এক ধরনের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে চীনের অবস্থান দৃঢ় করছেন।
শি জিনপিং এবং চীনের উত্থান পুরো আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। বেইজিং এখন কেবল অর্থনৈতিক হাব নয়; এটি রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং কূটনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি এবং তাদের কৌশলগত সিদ্ধান্ত এ নতুন বাস্তবতাকে আরও দৃঢ় করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন