দেশে কাজের স্বল্পতা ও প্রাপ্ত পারিশ্রমিক পরিবারের ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট না হওয়ায় দেশের বিপুলসংখ্যক কর্মক্ষম নারী ও পুরুষ বিদেশে কাজের জন্য যেতে আগ্রহী। প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম পুরুষ ও নারীকর্মী শ্রমবাজারে সংযোজিত হলেও স্থানীয় কর্মসংস্থানে ৫-৬ লাখ কর্মীর বেশি নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারে না। তাই এ ব্যাপকসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী স্বল্পমেয়াদে চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের নিমিত্ত বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন করে থাকে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিবাসী কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং দেশে ও প্রবাসে কর্মীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না মর্মে অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে নিয়োগের জন্য সরকার এরই মধ্যে দুই হাজারের অধিকসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে লাইসেন্স প্রদান করেছে। মূলত এ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বিদেশে কর্মী নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এত রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও গুটিকতক নেতৃস্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়া অন্যরা বিদেশে কর্মী প্রেরণের সুযোগ পায় না। আর এভাবেই গড়ে উঠেছে রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট। এ বিষয়টি ভালোভাবে দেখা গেছে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সময়।
বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে কর্মী গমন করে তার মধ্যে অন্যতম গন্তব্য দেশ হলো মালয়েশিয়া। খাদ্যাভাস, সংস্কৃতি, আবহাওয়াসহ বিবিধ কারণে এ দেশে নিয়োগ পেতে অনেক কর্মী আগ্রহী হন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে, গুটিকতক রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট এ শ্রমবাজারকে কুক্ষিগত করেছে এবং এ ক্ষেত্রে তারা বিগত সরকারের আনুকূল্যও পেয়েছে। বিগত সরকারের যেহেতু কোনো জবাবদিহির দায় ছিল না, কোনো কাজের স্বচ্ছতা ছিল না; ফলে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুটিকতক রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণের নামে যথেচ্ছভাবে আর্থিক লুটপাট করেছে। মালয়েশিয়ায় চাকরি নিয়ে যেতে একজন কর্মী সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা অভিবাসন ব্যয় হবে মর্মে সরকার ঘোষণা করলেও বাস্তবে গড়ে একজন কর্মী খরচ করছেন ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেড, সেবা কনসালট্যান্টস লিমিটেড, বাংলাদেশ মহিলা অভিবাসী শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন (বমসা), শ্রমিক কল্যাণ নাগরিক সংগঠন ওয়ারবি ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ফিফটি এইট মিলে ‘ব্যয়সংক্রান্ত জবাবদিহি ও খরচ নির্ণয়’ শিরোনামে গবেষণায় এ ফল বেরিয়ে এসেছে [দৈনিক প্রথম আলো, ১০ মে, ২০২৪]।
জানা যায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৩ সালের ২২ অক্টোবর প্রথমবার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। দ্বিতীয়বার ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর এবং তৃতীয়বার ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। ২০০৩ সালে প্রথমবার সমঝোতা স্মারকের পর সব রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সে সময় রিক্রুটিং এজেন্সি, নিয়োগকর্তা এবং দূতাবাসের শ্রম ইউংয়ের অনিয়মের কারণে কিছুদিনের মধ্যেই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ বন্ধ থাকে। পরে উভয় সরকারের প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং জি-টু-জি পদ্ধতি অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার সরাসরি কর্মী নিয়োগ করে মালয়েশিয়ার সরকারের কাছে প্রেরণ করবে। এ আয়োজনে নানাবিধ জটিলতা ও বিশেষ করে মালয়েশিয়া সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অসহযোগিতার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সে সময় সাড়ে ১২ হাজার কর্মী নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তাদের অভিবাসন ব্যয় শুরুতে ছিল মাত্র ২১ হাজার টাকা এবং পরে এ ব্যয় দাঁড়ায় ৩১ হাজার টাকা। অভিবাসন ব্যয় বিমান ভাড়ার ওপর নির্ভর করত। ২০১২ সালে পুনরায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয় এবং এবার অভিনবভাবে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের সুযোগ দেওয়া হয়। এত রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও কোন যোগ্যতাবলে ওই ১০টি এজেন্সি নির্বাচিত হয়, তা অজানা। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সে সময় মালয়েশিয়া প্রান্তে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক মালয়েশিয়ান মালয়েশিয়া সরকারকে প্রভাবিত করে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে বাছাই করার এ ব্যবস্থা সৃষ্টি করে সিন্ডিকেটের গোড়পত্তন করেন। বাংলাদেশ সরকারও কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে একটি অসম প্রতিযোগিতার বিষয়ে সায় দেয়। ওই ব্যক্তি মালয়েশিয়ায় ‘বায়োরিক্রুটমেন্ট’ নামক একটি আইটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করেন এবং মালয়েশিয়া থেকে নিয়োগকর্তার ডিমান্ড লেটার নিয়ন্ত্রণ করতেন। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী নিয়োগের অনুমতির বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কথিত এ ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি ছিল মুখ্য। এবারও কর্মীদের কাছ থেকে অধিক অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর কাজ না পাওয়া, নিয়োগকর্তার বেতন না দেওয়া, এক কাজের কথা বলে অন্য কাজ দেওয়া ইত্যাদি অভিযোগের কারণে এ উদ্যোগও ভেস্তে যায়। এ কারণে দায়ী রিক্রুটিং এজেন্সি বা সরকারি কোনো কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
সর্বশেষ ২০২১ সালে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু এবারও একই সিন্ডিকেট এর হোতা ওই ব্যক্তি ভিন্ন নামে দৃশ্যপটে হাজির হন। এবার তিনি আইটি প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট প্রতিষ্ঠা করেন। এ আইটি প্রতিষ্ঠানের সহযোগী কোম্পানি ফরেন ওয়ার্কাস সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) মালয়েশিয়া সরকারের বিদেশি কর্মী নিয়োগে অনলাইন সহায়তা প্রদান করে। এফডব্লিউসিএমএস নামক কোম্পানি মালয়েশিয়ায় ১৪টি দেশ থেকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা প্রদান করলেও বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বেলায় দুর্নীতি ও অসততার আশ্রয় নিয়েছে। এবারের চুক্তিতে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নির্বাচন করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এবারও আগের চক্রই পুনরায় এ সিন্ডিকেটকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্সির অন্যান্য সদস্য প্রবলভাবে আপত্তি করলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, নির্বাচিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি প্রত্যেকে ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের সুযোগ পাবে। এ নির্বাচনের বেলায়ও আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারণা করা যায়, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রভাব থাকলেই শুধু এ সিন্ডিকেটে ঢোকা সম্ভব হয়েছে। এ বিষয়ে আরও জানা যায়, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের জন্য নির্বাচিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে প্রতি কর্মী বাবদ ১.৫২ থেকে ১.৬৫ লাখ টাকা প্রদান করতে হতো। এ কারণেই অভিবাসন ব্যয় ক্রমাগতভাবে বেড়েছে। আমরা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ না পাওয়াসহ বিবিধ অভিযোগ জানতে পেরেছি। প্রত্যেক কর্মীই ধারদেনা করে অভিবাসন ব্যয় মিটিয়েছেন। আবার অনেক কর্মী অর্থ পরিশোধের পরও মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। কারণ, মালয়েশিয়া সরকার গত ৩১ মে’র পর কোনো কর্মীকে প্রবেশ করার সুযোগ দেয়নি। এর দায়ভার কোনো রিক্রুটিং এজেন্সি নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে যে, এ সিন্ডিকেট ৯৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ১১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা (১ ডলার = ১২০ টাক) মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে আদায় করেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশে এ সিন্ডিকেটের হোতা আদায়কৃত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছে। বাংলাদেশের সিন্ডিকেটের হোতারা মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের মেডিকেল টেস্ট করার জন্য দেশে কয়েকটি মেডিকেল সেন্টারও খুলেছে এবং এর অনুমোদন দিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। ফলে, সর্বত্রই অনিয়মের একটি আখড়া তৈরি হয়েছিল।
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া একটি নিয়মিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে না। নিয়োগ প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে সমগ্র অভিবাসনের প্রত্যেকটি ধাপ নিরাপদ ও অর্থবহ হবে। বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন ব্যয়ও বিশ্বের সর্বোচ্চ। অভিবাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় তথ্যের সহজগম্যতা, পর্যাপ্ত আইনি সহায়তা প্রদান, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং নিয়োগকর্তাদের বিভিন্ন বঞ্চনার প্রতিকারের জন্য একটি সমন্বিত অভিবাসন ব্যবস্থাপনা গ্রহণ বিশেষ জরুরি। নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের জন্য অভিবাসী কর্মীদের সব ধরনের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে যে কোনো সিন্ডিকেট প্রথার অবসান হওয়া আবশ্যক।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে বাংলাদেশে ১১ বছর পর সফর করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রথম কোনো দেশের সরকারপ্রধানের সফর। এ সফরে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের পাশাপাশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, এ ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা এরই মধ্যে জানা গেছে। আশা করি, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দিয়ে পূর্বে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক সংশোধন করা হবে অথবা নতুন করে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হবে। এর ফলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারাও যেন সঠিক কর্মী নিয়োগের সুযোগ পান এবং সব রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী প্রেরণের সুযোগ পান। অভিবাসন ব্যয়ও যেন যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং আর্থিক লেনদেনও যেন স্বচ্ছভাবে করা হয়। নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের জন্য এ কাজ এখনই করা জরুরি।
লেখক: সাবেক যুগ্ম সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়