২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ওলাফ শলৎজ জার্মানির চ্যান্সেলরের দায়িত্ব নেন। এর পরপরই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যান। অন্যদিকে ইউক্রেনকে সদস্যপদ দেওয়ার জন্য জেলেনস্কির চেয়ে বেশি অস্থির হন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। শলৎজ চ্যান্সেলর হওয়ার আড়াই মাসের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারপর দেশটি তিন বছর ধরে ক্ষেপণাস্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল রাশিয়া; দখল করে নিয়েছিল ক্রিমিয়া উপদ্বীপ। সে ঘটনায় জার্মানি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল নরম সুরে পরিস্থিতি শান্ত করার আহ্বান জানালেও উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাননি। অনাগ্রহের পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল। মের্কেলের জার্মানির সঙ্গে তখন রাশিয়ার সম্পর্ক যথেষ্ট মধুর। শলৎস রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইউক্রেনকে ধনে-মনে সবদিকে সহযোগিতা করে যান।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জার্মানি যেদিকে তাকাত, ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ মোটামুটি সেভাবেই সেদিকে তাকাত। তা ছাড়া তাদের সঙ্গে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মের্কেল বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করতেন। শলৎস যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম বন্ধু প্রথম থেকেই। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের ঠিক এক মাসের মাথায়—২০২২ সালে ৭ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে দুই নেতা একসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে আসেন। সংবাদ সম্মেলনে জার্মানিকে শলৎজ হাজির করেন রাশিয়ার শত্রুরূপে। আর যুক্তরাষ্ট্র তো বহু আগে থেকেই রাশিয়ার শত্রু। শলৎস-বাইডেন দুই বন্ধু এক সুরে শক্ত অবস্থান নিয়ে জানান, রাশিয়া যদি ইউক্রেনে হামলা করে তাহলে তারা সম্ভাব্য সব উপায়ে প্রতিরোধ করবেন, ইউক্রেনকে তারা অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করবেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তারা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবেন ইত্যাদি। তারা এও জানান, ইউক্রেনকে তারা ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়াবেনই। এমন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনে রাশিয়া হামলা করবে তা সারা দুনিয়া জানত। শলৎজ জানতেন না? জানতেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তা পরিষ্কার।
কেন জার্মানির এই ইউটার্ন?
২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জার্মানির পররাষ্ট্রনীতি আধুনিকরূপে রূপান্তরিত করেন।’ বস্তুত, হঠাৎ করে কিছু হয় না। এসব শলৎজ আগে থেকেই ভাবছিলেন তা পরিষ্কার। ক্ষমতায় আসার আড়াই মাসের মাথায়, ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, তিনি পার্লামেন্ট অধিবেশনে জার্মান সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ১১৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের ঘোষণা দেন। এতে পার্লামেন্টে শোরগোল পড়ে যায়। কিছু সদস্য হাততালি দেন। কেউ কেউ গালাগালি করেন। অনেকেই হতবাক হয়ে যান। ওইদিন শলৎজ জার্মানির নিরাপত্তা, পররাষ্ট্র ও জ্বালানিনীতিতে যে কৌশলগত পরিবর্তনের রূপরেখা দেন, তা ফেডারেল জার্মান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা বলেই বিবেচিত। শলৎসের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রী উলফ গ্যাং শ্মিটের বক্তব্য স্মরণ করি। শ্মিট সে সময় বলেন, ‘জার্মানির বৈদেশিক নিরাপত্তানীতি এখনো কিশোর পর্যায়ে রয়েছে।’ তিনি তাকে তারুণ্য দিতে চান। শলৎজ হামবুর্গের মেয়র (২০১১-১৮) থাকার সময় থেকে তার ডান হাত হয়ে ওঠেন শ্মিট। শলৎস-শ্মিট দুজনই যুক্তরাষ্ট্রের মতো এক সুরে দোহাই দেন, রাশিয়া ঘরের মধ্যে এসে পড়ল! ইউক্রেনে এসে পড়েছে।
এরপর পোল্যান্ড-চেকোস্লাভিয়া হয়ে দুই হাজার কিলোমিটার তেড়েফুঁড়ে জার্মানি পৌঁছে যাবে! রাশিয়া যখন প্রয়োজনে যে কোনো উপায়ে ন্যাটোকে ইউক্রেন থেকে দূরে রাখার ঘোষণা দেয়, এ ঘোষণাকে পারমাণবিক বোমা হামলার হুমকি হিসেবে ধরে নেন শলৎস-শ্মিট। তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গলা মেলাতে শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এটাই চাচ্ছিল। অ্যাঙ্গেলা মের্কেল সেদিকে যাননি। কিন্তু শলৎজ শুধু জার্মানিকে নিয়ে ভাবছেন না। তিনি উচ্চাভিলাষী। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে গুরুতর সংকটে ভুগতে থাকা ইউরোপ নেতৃত্ব খুঁজছে। শলৎজ ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করছেন।’
শলৎজ প্রাগে এ বিষয়ে ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্য রাখেন। গোটা ইউরোপ নিয়ে তিনি তার উদ্বেগ, দায়িত্ব, পদক্ষেপ, প্রস্তুতি নিয়ে ভাষণ দেন। এর এক মাসের মধ্যে ইউক্রেনের চার অঞ্চল—খেরসন, জাপোরিঝঝিয়া, দোনেৎস্ক, লুহানস্ক দখল করে নেয় রাশিয়া। অন্তর্ভুক্তির সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও শেষ করে ত্বরিতগতিতে। টাইম ম্যাগাজিন এ বিষয়ে যা বলছে তা হলো, ‘চ্যান্সেলর শলৎজ বিশ্বে জার্মানির অবস্থান রূপান্তর করতে চান। তবে তিনি তা মুখে কদাচিৎ বলেন।’
প্রশ্ন হচ্ছে, শলৎজ যদি রাশিয়ার বিপক্ষে তার অবস্থান এতটা স্পষ্ট না করতেন, তাহলে কি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এতদূর গড়াত? ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়, তখন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেল মূলত নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন। বেশ নরম সুরে তিনি শুধু যুদ্ধাবসান চেয়েছিলেন। অন্যদিকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গোছগাছ করে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। মানবতাবাদী পরামর্শ ছিল তার সেই বক্তৃতায়। তখন অ্যাঙ্গেলার ওপর মার্কিন কূটনৈতিক চাপ ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেন উত্তেজনা চাপিয়ে রাখতে পারেননি। আগে থেকেই রাশিয়ার ঘরের কোনায় একটা ঘাঁটি গাড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র। কাজটা করার জন্য তারা মরিয়া হয়ে ওঠে, যখন চীন-রাশিয়ার বন্ধুত্ব বেড়ে ওঠে এবং তুরস্ক প্রতিনিয়ত লায়েক হতে থাকে। লায়েক হতে হতে রাশিয়ার সঙ্গেও খাতির বাড়িয়ে চলে। এখন তাহলে ইউক্রেনে ঘাঁটি গাড়ার জন্য জার্মানিই সবচেয়ে ক্ষমতাবান সহকারী। কিন্তু শলৎজ এক দুর্বল কান্ডারি। তিনি সবকিছু গুবলেট করে ফেলেন।
ষাটোর্ধ্ব শলৎজ অনেক আগে থেকেই ব্যক্তিগত ইমেজের জন্য আলোচিত। পশ্চিমা গণমাধ্যমে তাকে অহরহ ‘রোবটের মতো’ বলে উল্লেখ করা হয়। যান্ত্রিক ভঙ্গিমার জন্য তাকে শোলজোম্যাট বলে ডাকা হয়। তিনি যখন চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের ডেপুটি (২০১৮-২১) ছিলেন, তখন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে প্রায় কিছুই বলেননি। মের্কেলের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বও তিনি পালন করেন। ফলে তার রাজনৈতিক সহকর্মীসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করতেন, তিনি মের্কেলের ধারাই টেনে নেবেন। কিন্তু তিনি উল্টো পথে হাঁটেন, যা আগে কেউ কল্পনা করেনি। ‘নর্ড স্ট্রিম’ নামে গ্যাস পাইপলাইন, যা দিয়ে রাশিয়া থেকে গ্যাস যায় জার্মানিতে। এই প্রকল্প ২০০০ সালে শুরু করেন চ্যান্সেলর শ্রোয়েডার। ২০১১ সালে ‘নর্ড স্ট্রিম ১’ থেকে গ্যাস যাওয়া শুরু হয়। ‘নর্ড স্ট্রিম ২’ প্রকল্প উৎসাহ ভরে এগিয়ে নেন মের্কেল, যা চালু হলে জার্মানির সব বাড়ি—২ কোটি ৬০ লাখ—শীতের সময় গরম রাখা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা থাকত না। প্রকল্পটা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সুইচ টিপলেই গ্যাস যাবে। কিন্তু শলৎজ এটা বন্ধ ঘোষণা করেন। কারণ রাশিয়ার ওপর আর নির্ভরশীল থাকবেন না বলে তিনি ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এ পাইপলাইনের বিরোধিতা করে আসছিল। এ চাপের সামনে নতিস্বীকার করেননি চ্যান্সেলর মের্কেল।
সংগত কারণেই শলৎজ জনপ্রিয়তা হারাতে শুরু করেন। হামবুর্গের মেয়র থাকাকালে তিনি যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, তা ধূলিসাৎ হয়ে যায় অর্ধবছরের মধ্যে। তিনি হামবুর্গ শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রসারিত করেছিলেন, শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি বাতিল করেছিলেন, এলবে নদীকে গভীর ও প্রসারিত করে বড় কনটেইনার জাহাজ চলাচলের উপযোগী করার প্রকল্প এগিয়ে নিয়েছিলেন। এসব ছিল তার জনপ্রিয়তার কারণ। কিন্তু জার্মান সামরিকনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে শোলজোম্যাট কী করেছেন, তা তিনি নিজেই হয়তো জানেন না। ফলে ২০২৫ সালের নির্বাচনে তার ভরাডুবি হয়েছে। এবার যিনি নতুন চ্যান্সেলর হবেন, তিনি কী করবেন তাই দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব এখন।
লেখক: সাংবাদিক
মন্তব্য করুন