শনিবার, ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২
প্রণব চক্রবর্তী
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:৫৭ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ প্রস্তুতি

চৈত্রসংক্রান্তি ও বর্ষবরণ প্রস্তুতি

বাংলা বছরের শেষ দিন, অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিনকে বলা হয় চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন হিসেবে পুরোনোকে বিদায় ও নতুন বর্ষকে বরণ করার জন্য প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি ঘিরে থাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান-উৎসবের আয়োজন। আবহমান বাংলার চিরায়ত বিভিন্ন ঐতিহ্যকে ধারণ করে আসছে এই চৈত্রসংক্রান্তি।

চৈত্রসংক্রান্তিকে অনুসরণ করেই পহেলা বৈশাখ উদযাপনের এত আয়োজন। তাই চৈত্রসংক্রান্তি হচ্ছে বাঙালির আরেক বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব। একসময় বাংলায় প্রতিটি ঋতুরই সংক্রান্তির দিনটি উৎসবের আমেজে পালন করত বাঙালি। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে সে উৎসব। তবে আজো বাঙালি আগলে রেখেছে সংক্রান্তির দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবকে। একটি চৈত্রসংক্রান্তি, অন্যটি পৌষসংক্রান্তি।

চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বাড়িঘর, আসবাব ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। বাড়িঘর সাজানো হয় নতুন বছরের শুরু উপলক্ষে। চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য এলাকায় ঘরের দরজায় দীর্ঘদিন স্থায়ী ফুলের মালা ও নিমপাতার গুচ্ছ টানানো হয়।

আটকড়াই ও লাওন: চট্টগ্রাম অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম আকর্ষণ আটকড়াই ও খই, যব, মুড়ির ছাতু দিয়ে তৈরি লাওন (বিশেষ নাড়ু)। দুধ বা দই সহযোগে গুড় দিয়ে এই লাওন অত্যন্ত উপাদেয় ও মনোরঞ্জক। আটকড়াই হলো বুট, বাদাম, তিসি, কুমড়া বীজ ভাজা, শিমের বীজ ভাজা, চাল ভাজা, শসার বীজ ভাজা, কিশমিশ ইত্যাদি সহযোগে মচমচে ভাজা।

চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু। বাঙালির সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব পালিত হয় এ দুই দিনে।

চৈত্রসংক্রান্তির দিন সনাতন ধর্মচারীরা শাস্ত্র মেনে স্নান, দান, ব্রত, উপবাস করে থাকেন। শিবের গাজন ও ধর্মের গাজন নামে পালাগানও অনুষ্ঠিত হতে দেখা যায়। গাজন মূলত কৃষকদের উৎসব। চৈত্রের দাবদাহ থেকে রক্ষা পেতে বৃষ্টির জন্য চাষিরা পালার আয়োজন করে থাকেন, যা গাজন নামে পরিচিত। কিছু কিছু স্থানে চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন।

এ ছাড়া চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে নানা ধরনের মেলা ও উৎসব হয়। নববর্ষের হালখাতার জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাজানো, লাঠিখেলা, গান, সংযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় চৈত্রসংক্রান্তি। বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির প্রস্তুতি এ দিনের অন্যতম আকর্ষণ।

চড়ক পূজা

চৈত্রসংক্রান্তির প্রধান আকর্ষণ চড়ক পূজা। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। এ উপলক্ষে গ্রামের শিবতলা থেকে শোভাযাত্রা শুরু করে অন্য গ্রামের শিবতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে।

চৈত্রসংক্রান্তির মাধ্যমে পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে সফলতা ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশায় দেখা দেবে নতুন ভোর। জরাজীর্ণতা, ক্লেশ ও বেদনার সব কিছুকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি সব অন্ধকারকে বিদায় জানিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার থাকবে গোটা জাতির।

বাঙালি বাড়িতে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে তেতো খাবার খাওয়া হয়। বিশ্বাস আছে, এ ধরনের খাবার খেলে সারা বছর সুস্থ থাকা যায়। এ ছাড়া বছর শেষে তীব্র গরমে বিভিন্ন ধরনের রোগ-বালাইয়ের যে প্রাদুর্ভাব ঘটে, তা থেকে প্রাকৃতিক পরিত্রাণের এটি একটি অন্যতম উপায়। এদিন আরও বহু খাবার খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে বাংলার ঘরে ঘরে।

অনেকেই এই দিন ব্রত পালন করেন। এ সময় আমিষ খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। খাবারের তালিকায় থাকে শাকসবজিসহ সাত রকমের তেতো খাবার। যেমন—

নিম পাতা: নিম পাতা ও চাল ভেজে একসঙ্গে খাওয়া চৈত্রসংক্রান্তির বহু পুরোনো ধারা। অনেকের ধারণা, এই খাবার খেলে সারা বছর সুস্থ থাকা সম্ভব। এতে শরীরে নানা ধরনে সমস্যা কমে বলেও মনে করা হয়।

নিরামিষ তরকারি: যারা ব্রত পালন করছেন, তারা তো বটেই, পাশাপাশি অন্যরাও এদিন বাড়িতে নানা ধরনের নিরামিষ তরকারি রান্না করেন। বিভিন্ন শাক দিয়ে এই তরকারি রান্না করা হয়। এগুলো শরীরের নানা উপকার করে বলে মনে করা হয়।

শজিনা চচ্চড়ি: চৈত্রসংক্রান্তিতে অনেক বাড়িতে শজিনা চচ্চড়ি করা হয়। তা দিয়ে যেমন অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়, তেমনি এটি শরীরের উপকারও করে থাকে।

তেতো ডাল: এটি খুবই প্রচলিত পদ। চৈত্রসংক্রান্তিরও অন্যতম খাবার তেতো ডাল। উচ্ছে দিয়ে সাধারণত এই ডাল বানানো হয়।

গিমা শাক: গ্রামের বাড়িতে এদিন গিমা শাক ও বেগুন দিয়ে তরকারি রান্না করা হয়। এসব তরকারি খেতে দেওয়া হয় যারা ব্রত পালন করছেন, তাদের।

কাঁঠালের তরকারি: চৈত্রসংক্রান্তির আর একটি উল্লেখযোগ্য খাবার কাঁঠালের তরকারি। কাঁচা কাঁঠালের (ইঁচড়) নানা অংশ দিয়ে এই তরকারি রান্না করা হয়।

নারকেল নাডু: শেষ পাতে এদিন অনেক বাড়িতে নারকেলের নাড়ু পরিবেশন করা হয়। অতিথি আপ্যায়নে চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম অনুষঙ্গ এই খাবার। চৈত্রসংক্রান্তিতে নকশি পিঠাও বানানো হয়।

ভগবতী পূজার প্রস্তুতি

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে সনাতনীরা লক্ষ্মী, গণেশ ও ভগবতী পূজার প্রচলন রয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে এজন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ভোর না হতেই নারীরা স্নান সেরে, লাল পেড়ে শাড়ি পরে লেগে পড়েন ভগবতী পূজাতে বাড়িতে থাকা চৈত্র শেষের গোয়ালঘর পরিষ্কার করে আয়োজন করেন ভগবতী পূজার। গোয়ালঘর পরিষ্কার করে সুন্দর করে আলপনা আঁকেন নারীরা। এদিন গরুকে পছন্দের খাবার খেতে দেন। গরুর দুধ দোহন করে তা গোয়ালঘরেই জ্বাল দেওয়া হয়। সেই দুধ উথলে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন নারীরা। বলা হয়, দুধ উথলে উঠলে গরুর দুধের পরিমাণ বাড়বে। ভগবতী মাতার দানের দুধে তারা তাদের সন্তানদের দুধে-ভাতে লালন-পালন করতে পারবেন সারা বছর।

এখনো অনেক বাড়িতেই বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন এই ভগবতী পূজা হয়ে থাকে। ভগবতী পূজার আশীর্বাদের ফুল দিয়ে তারা মাঠে বীজ বপন করেন এবং তাদের বিশ্বাস—ভগবতী মাতার আশীর্বাদ পেলে তাদের সারা বছর সুখে-শান্তিতে কাটবে।

লেখক: ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কমিটির উপদেষ্টা পুরোহিত; সম্পাদক জয় বাবা লোকনাথ পঞ্জিকা এবং অতিরিক্ত সচিব (অব.)

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নুরকে দেখতে এসে আসিফ নজরুল অবরুদ্ধ 

আহত নুরকে দেখতে ঢামেকে প্রেস সচিব

সহিংসতার ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিবৃতি

সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও ওরা থামেনি : হাসনাত

মাদুশঙ্কার হ্যাটট্রিকে লঙ্কানদের রুদ্ধশ্বাস জয়

নুরের ওপর হামলার কড়া প্রতিবাদ ছাত্রদলের

ভারতীয় বক্সারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন হাসান শিকদার

আসিফ নজরুলকে তুলোধুনো করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ

২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিল গণঅধিকার পরিষদ

ইংল্যান্ড সফরের জন্য বাংলাদেশ দল ঘোষণা

১০

নিজেদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী নেদারল্যান্ডস কোচ

১১

‘মার্চ টু জাতীয় পার্টি অফিস’ ঘোষণা

১২

‘নুরের ওপর হামলা পক্ষান্তরে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর হামলা’

১৩

লজ্জাবতী বানরের প্রধান খাদ্য জিগার গাছের আঠা!

১৪

নুরের শারীরিক সর্বশেষ অবস্থা জানালেন রাশেদ

১৫

আকাশ বহুমুখী সমবায় সমিতি ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

১৬

শ্রীমঙ্গলে পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ 

১৭

মৌলিক সংস্কার শেষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে হবে : ডা. তাহের

১৮

২০ বল করার জন্য ৩৪ হাজার কিলোমিটার উড়ে যাচ্ছেন অজি স্পিনার

১৯

সড়কে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব / যানজট নিরসনে ভুমিকা নেওয়ায় সুবিধাভোগীদের রোষানলে পুলিশ কর্মকর্তা

২০
X