

দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা বৈদেশিক কর্মসংস্থানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতটির নানামুখী সংকট নিয়ে সোমবার কালবেলায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা সুখকর বার্তা নয়। ধারাবাহিকভাবে পুরোনো শ্রমবাজার সংকোচন ও নতুন বাজারে প্রবেশ ব্যাহতসহ আরও কিছু সংকট যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে, তা হতাশার।
প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, অভিযোগ ও হয়রানিতে আস্থা হারাচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো, মালয়েশিয়া চুক্তি ও বাস্তবতার ফারাক, প্রস্তুতির ঘাটতিতে নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশে ব্যর্থতা রয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলা, ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্টে নেতিবাচক অবস্থানসহ বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশি শ্রমবাজার। সম্প্রতি সিআইডি ও দুদক বেশ কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব মামলা অনেক ক্ষেত্রে প্রমাণ ছাড়াই হচ্ছে বলে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের তদন্ত-পরবর্তী মামলার আগেই ব্যবসায়ীরা হয়রানির মুখে পড়ছেন। জটিল হচ্ছে লাইসেন্স নবায়ন। ঢালাও মামলায় বিপদে পড়ছেন সৎ ব্যবসায়ীরা এবং আড়ালে থেকে যাচ্ছে প্রকৃত অপরাধীরা। আবার সরকার দীর্ঘদিন ধরে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও পোল্যান্ডে নতুন শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নিলেও বাস্তবতা অনেকটাই পিছিয়ে। জাপানের ‘টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রাম’ বা দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস প্রোগ্রামের মতো স্কিমে ভাষাগত ও কারিগরি প্রস্তুতির অভাবে বাংলাদেশিরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। চলতি বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় কোটা কমেছে ১৮ শতাংশ। আমাদের শ্রমিকের মান নিয়ে সংশয় বাড়ায় দেশগুলো তুলনামূলক যারা দক্ষ তাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পাশাপাশি দুদক ও সিআইডির মামলা ও তদন্তের ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ধীরগতির অভিযোগ উঠেছে। এদিকে মালয়েশিয়া নিয়োগ কার্যক্রম আপাতত বন্ধ। কারণ হিসেবে দেশটি দেখিয়েছে—নিয়োগে স্বচ্ছতা ও অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্টে বাংলাদেশ ২০২৫ সালে ফের ‘ওয়াচলিস্ট’-এ স্থান পেয়েছে। ফলে বিশ্ব শ্রমবাজারে দেশের ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিদেশি নিয়োগকারী দেশগুলো ঝুঁকিপূর্ণ দেখছে বাংলাদেশকে। গত কয়েক বছরে শ্রমবাজার সংকোচনের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা খাতটির জন্য অশনিসংকেত। কয়েকটি দেশে সংকোচন প্রবণতার পরিসংখ্যান—২০২৩ সালে মালয়েশিয়ায় ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী গেলেও ২০২৪-এ তা কমে দাঁড়ায় ৯৩ হাজার ৬৩২-তে। চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত সেখানে গেছেন মাত্র ২ হাজার ৪৮৬ জন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০২৩ সালে ৯৮ হাজার ৪২২ জন গেলেও ২০২৪-এ সংখ্যাটি ৪৭ হাজার ১৬৬ জন। চলতি বছর মে পর্যন্ত এ সংখ্যা ২ হাজার ৯৯৩ জন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে শ্রমিক প্রেরণ আগের বছরের তুলনায় কমেছে ২৩ শতাংশ।
আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণভোমরা শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতের সংকোচনপ্রবণ এ চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া উচিত। সংকট নিরসন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তাৎপর্য বিবেচনায় নিয়ে খাতটি ঘিরে বিরাজমান সংকট দূর করতে ব্যর্থ হলে, তা আগামীতে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা, গত কয়েক বছর সংকটাপন্ন অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়, যা এখনো চলমান। আমাদের প্রত্যাশা, এ খাতে উদ্ভূত বহুমুখী চাপ উত্তরণে সুনির্দিষ্ট নীতি, স্বচ্ছ তদন্ত ও দক্ষ প্রশাসনসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হবে।