একটা গল্প বলি। এক মহিলা মৃত্যুশয্যায় তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু তার সতিনকে ডেকে বললেন, আপা আপনাকে অনেক জ্বালিয়েছি। এখন মৃত্যুর সময় আমাকে মাফ করে দিয়েন। আর মরার সময় আমার এ ছেলেটাকে আপনার হাতে দিয়ে গেলাম। তাকে একটু দেখে রাইখেন। সেই মহিলার মৃত্যুর পর তার সতিন নিজের সন্তানকে রেখে সতিনের সন্তানকে কোলে তুলে নেয়। তারপর থেকে নিজের সন্তান মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। আর সতিনের সন্তান কোলেই থাকে। সবাই খুব অবাক, তুমি এত ভালো এটা আগে বুঝিনি। যে সতিন তোমাকে এত জ্বালাল, তার সন্তানকে তুমি এত ভালোবাসো। কোলে কোলে রাখো। আর নিজে ছেলের প্রতি কোনো নজরই নেই। তখন সেই মহিলা উত্তর দিল, নিজের ছেলেকে আমি এমনভাবে বড় করছি, যাতে সে পৃথিবীতে চলে ফিরে খেতে পারে। আর সতিনের ছেলেকে কোলে কোলে রেখে এমন বানাচ্ছি, যাতে কোল থেকে নামালে সে আর চলতে না পারে।
সেই মহিলার সতিনের ছেলের মতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন কিছু এতিম রাজনৈতিক দল আছে, যারা বড় দলগুলোর ছায়ায় থাকতে থাকতে নিজেদের সামর্থ্য হারিয়েছে, স্বকীয়তা ভুলে গেছে। এত পুরোনো, এত নামকরা, এত বড় দল; কিন্তু নিজেদের যোগ্যতায় একটি আসনে জেতার সামর্থ্য নেই কারও। এটা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক।
এমনিতে বাংলাদেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ আর অ্যান্টি আওয়ামী লীগ—এ দুই ধারায় বিভক্ত। স্বাধীনতার আগে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিপক্ষ ছিল মুসলিম লীগ। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের মূল প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে আসে জাসদ। আর ৭৫-এর পর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপি হয়ে যায় আওয়ামীবিরোধী রাজনীতির আশ্রয়কেন্দ্র। বাংলাদেশের ভোটাররাও মোটা দাগে এ দুই দলেই বিভক্ত। সব দল আলাদা আলাদা নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ আর বিএনপিই সিংহভাগ আসনে জিতবে। এ দুই দলের বাইরে কিছু ভোট আছে জাতীয় পার্টি আর জামায়াতে ইসলামীর। কিন্তু এ দুটি দলেরও আলাদা নির্বাচন করে খুব বেশি আসন জেতার সামর্থ্য নেই। তাই জামায়াত বিএনপির সঙ্গে আর জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপিও জানে প্রতিপক্ষ জোট বাঁধলে নিজেদের ভোটব্যাংকে তাদের মোকাবিলা করা মুশকিল। তাই ভোটব্যাংক বাড়াতে তারা ছোট দলগুলোকে কাছেই রেখেছে।
ভোটের হিসাবে চতুর্থ বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামীর এখন নিবন্ধনই নেই। ২০১৪ সালের পর থেকে কার্যত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে বিএনপি। আওয়ামী লীগের মহাজোটে থাকলেও বিএনপির অনুপস্থিতিতে জাতীয় পার্টিই সংসদে বিরোধী দলের আসনে। কিন্তু দুই দফা সংসদে প্রধান বিরোধী দল হলেও জাতীয় পার্টি বাস্তবে বিরোধী দল হতে পারেনি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর গঠিত দশম সংসদে জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে বিরোধী দল ও মন্ত্রিসভায় ছিল। বিভিন্ন সময় কথায় বিরোধী দল হওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির বিরোধী দল হওয়া হয়ে ওঠেনি। এবার তাদের সামনে সত্যিকারের বিরোধী দল হয়ে ওঠার এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় দেশের বিপুলসংখ্যক ভোটার আওয়ামী লীগের ওপর বিরক্ত। নির্বাচনে বিএনপির না থাকার সুযোগটি নিতে পারত জাতীয় পার্টি। নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য এবং বিএনপির ভোটব্যাংক কাছে টানতে পারলে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও জাতীয় পার্টি হতে পারত সত্যিকারের বিরোধী দল। কিন্তু সেই চেষ্টা না করে জাতীয় পার্টি বরং কয়েকটি আসনে জয় নিশ্চিত করতে দিনের পর দিন আওয়ামী লীগের কাছে ধরনা দেয়। শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৬ আসনে রফা। নিজেদের সামর্থ্যের ওপর জাতীয় পার্টির আস্থা এতটাই কম, আওয়ামী লীগের ছেড়ে ২৬ আসনে নৌকা তো বটেই, এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও সরিয়ে দেওয়ার আবদার তাদের, যাতে মাঠ একদম ফাঁকা থাকে।
২০০৬ সালের পর থেকেই জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের মহাজোটের অংশীদার। তাতে তারা দুবার প্রধান বিরোধী দল হয়েছে। জাতীয় পার্টির নেতারা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। বেঁচে থাকতে এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়েছেন। কিন্তু দল হিসেবে জাতীয় পার্টির সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে এ সময়েই। এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে ১৯৮৬ ও ’৮৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছিল জাতীয় পার্টি। ’৯০ সালে এরশাদ পতনের পর ’৯১ সালের নির্বাচনে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও একক নির্বাচন করে জাতীয় পার্টি ৩৫ আসন পেয়েছিল। কিন্তু বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট করার পর থেকেই জাতীয় পার্টির জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। জোটের সুবিধায় কিছু আসন হয়তো তারা পাচ্ছে; কিন্তু নিজস্ব ভোট ও আসন দুটিই কমেছে জাতীয় পার্টির। এভাবে চলতে থাকলে দলটি একসময় মুসলিম লীগে পরিণত হবে।
জাতীয় পার্টির এ পরিণতি আমাকে আনন্দিত করে। আমাদের যৌবন আমরা ব্যয় করেছি স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর আমাদের ধারণা ছিল, এরশাদ ও জাতীয় পার্টি কখনোই বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। জনগণ তাদের মেনে নেবে না। কিন্তু পতনের বছর সাতেকের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধে জাতীয় পার্টি জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের জায়েজ করে নেয়। যে দুই দল এরশাদের বিরুদ্ধে ৯ বছর সংগ্রাম করল, তারাই তাদের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করল। এটা দেখে আমার খুব খারাপ লেগেছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একজন মাঠের কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতারিত মনে হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোট করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে জাতীয় পার্টি। আবার আওয়ামী লীগের হাত ধরে জাতীয় পার্টি ক্ষমতার কাছাকাছি এসেছে, জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল হয়েছে, এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হয়েছেন। তাই আওয়ামী লীগের প্রতি রাগটা বেশি ছিল। কিন্তু আজ রাজনীতির হিসাব মেলাতে গিয়ে যখন দেখি আওয়ামী লীগ কাছে রেখে রেখে, গৃহপালিত বিরোধী দল বানিয়ে জাতীয় পার্টিকে আসলে পঙ্গু বানিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ‘কিস অব ডেথে’র শিকার জাতীয় পার্টি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি দেখতে আমার খারাপ লাগছে না।
জাতীয় পার্টিকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখলে খারাপ না লাগলেও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি আর জাসদের মতো আদর্শিক দলগুলোর দুরবস্থা দেখতে কষ্ট হয়। এ দুটি দলই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক। জাতীয় পার্টিসহ মহাজোট হলো আওয়ামী লীগের ভোটের হিসাবে কৌশলগত জোট। আর ১৪ দল হলো আদর্শিক জোট। নাম ১৪ দলীয় জোট হলেও, গুনে গুনে ১৪টি দল বের করা মুশকিল। আওয়ামী লীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় পার্টি-জেপি, সাম্যবাদী দল—এ কয়টিই পরিচিত দল। ১৯৭২ সালে জাসদ গঠিতই হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতা করার জন্য। ’৭৩ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচনে মাত্র পাঁচটি আসন পেলেও আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল জাসদ। নানা সময়ে ভাঙতে ভাঙতেও কোনোরকমে টিকে আছে দলটি। এখন জাসদের মূলধারার নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসানুল হক ইনু। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতেই জন্ম নেওয়া সেই জাসদ আজ আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানে মেধাবী তারুণ্যকে কাঁপিয়ে দেওয়া জাসদ আজ এক দেউলিয়া দল। নির্বাচন যতই সুষ্ঠু আর নিরপেক্ষ হোক, সারা বাংলাদেশে কোনো একটি আসনেও জেতার সামর্থ্য নেই দলটির কারও। ২০১৪ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগের অনুকম্পায় কখনো ছয়টি, কখনো তিনটি আসন পায়। তাতেই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় হাসানুল হক ইনু একবার মন্ত্রীও হয়েছেন। যারা একসময় আওয়ামী লীগ সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন, জাসদের সেসব পুরোনো নেতাকর্মীর আওয়ামী লীগের অনুকম্পায় রাজনীতি করতে কেমন লাগে জানি না; আমার খুব খারাপ লাগে, করুণা হয়। জাসদের দেউলিয়াত্ব এতটাই প্রকট হয়েছে, জয় নিশ্চিত করতে নিজেদের দলীয় প্রতীক মশাল রেখে আওয়ামী লীগের করুণায় পাওয়া তিন আসনে দলীয় প্রার্থীরা নৌকা প্রতীকে লড়বেন। স্বাধীনতার পরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সময় বঙ্গবন্ধু সরকারকে বারবার বিব্রত করা জাসদকে কাছে রেখে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলে কি শোধ নিচ্ছেন শেখ হাসিনা?
একই অবস্থা ওয়ার্কার্স পার্টিরও। দীর্ঘদিন ধরে আদর্শিক রাজনীতি করলেও নিজেদের শক্তিতে জেতার মতো সারা দেশে একটি আসনও নেই তাদের। আওয়ামী লীগের দয়ায় দুই-তিনটি আসন পায়। দলটির প্রধান রাশেদ খান মেনন একাদশ সংসদে ঢাকা-৮ আসনের সাংসদ। আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় এবার তাকে নির্বাচন করতে হবে বরিশাল-২ থেকে। প্রাথমিকভাবে ওয়ার্কার্স পার্টিকে তিনটি আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত ভাগে মিলেছে দুটি। কিন্তু প্রতিবাদ করারও উপায় নেই তাদের। আওয়ামী লীগ এবার জাসদকে তিনটি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে দুটি আসন ছেড়েছে। তাও আওয়ামী লীগের পছন্দমতো। সংখ্যা তো বটেই, এমনকি আসন বেছে নেওয়ারও স্বাধীনতা নেই তাদের।
জাতীয় পার্টি-জেপির অবশ্য আদর্শের বালাই নেই। স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু নিজের মন্ত্রিত্ব টিকিয়ে রাখতে আলাদা জাতীয় পার্টি গড়েছিলেন। জেপির জন্য, আসলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জন্য আওয়ামী লীগ বরাবরই একটি আসন বরাদ্দ রাখে। বলার মতো আর কোনো নেতাই নেই জেপিতে।
সাম্যবাদী দলের প্রধান দিলীপ বড়ুয়া অবশ্য সারাজীবন বাম রাজনীতি করে এসেছেন। শেখ হাসিনার দয়ায় একবার টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রীও হতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু এ দলের কারও ভাগ্যে কখনো এমপি হওয়ার সুযোগ আসেনি। আমি বলে দিতে পারি, কখনো আসবেও না।
এতদিন আদর্শের রাজনীতি করে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল; হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেনন, দিলীপ বড়ুয়াদের অর্জনটা আসলে কী? তাদের রাজনীতির শেষ লক্ষ্য কি তবে আওয়ামী লীগের দয়ায় যেনতেনভাবে সংসদে যাওয়া?
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ