সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:২৯ এএম
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৫৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ভোট উৎসব নাকি উত্তেজনা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
ভোট উৎসব নাকি উত্তেজনা

নির্বাচন কমিশন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, শাসক দল বলছে আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশে এখন ভোট উৎসব চলছে। কিন্তু এটা কি উৎসব? বাস্তব কি তাই বলে? উৎসব তা-ই, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, চাপমুক্ত মনে, মিলেমিশে মজা-আনন্দে মেতে ওঠেন। ভোটে কি এসব দেখছি? সব ভোটার কি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে চাপ, ভয়, লোভ, শাসানি থেকে মুক্ত হয়ে মহাআনন্দে ভোটের পরিবেশে মিশতে পারছেন?

কথাগুলো এ কারণে এলো যে, গত ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকে পুরো নির্বাচনী চিত্রটাই যেন বদলে গেছে। বিএনপি ও তার সহযোগী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে। মাঠে শুধু আওয়ামী লীগ আর আওয়ামী লীগ এবং তাদের মধ্যেই সংঘাত, সংঘর্ষ আর সহিংসতা। ফ্রি-স্টাইলে চলছে মারামারি, হিংসা, রক্তপাত, প্রাণহানি। একই দলের নেতাদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি, গরম-গরম ভাষণ ও হুংকার উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে মানুষে মানুষে যুদ্ধ যুদ্ধ আবহ তৈরি করেছে সারা দেশে। তাই এটিকে উৎসব না বলে বলতে পারি নির্বাচনের উত্তেজনা।

আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রার্থী বনাম আওয়ামী লীগ অনুমোদিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর কেচ্ছা এখন পত্রিকার পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দায় এবং মানুষের মুখে মুখে। নির্বাচন কমিশনের হুমকি, ধমকি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিশ্রুতি কিছুই সহিংসতা থামাতে পারছে না। নির্বাচনী অফিসে আগুন, বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, সমর্থককে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পেশিশক্তির এসব লড়াই দেখে আতঙ্কিত ও স্তম্ভিত সাধারণ ভোটার।

নৌকার বাইরে গিয়ে কেউ কোনো কথা বললে তার গলা নামিয়ে দেওয়া হবে—এমন হুমকি আসে কোনো প্রার্থীর দিক থেকে আবার কোথাও উল্টোটাও ঘটছে। প্রার্থীরা সবাই যেহেতু শাসক দলের সেহেতু কারও মুখেই লাগাম নেই।

এমনটাই ঘটার কথা ছিল। সংবাদমাধ্যম আগাম সতর্কবার্তাও জারি করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড এ বিরোধকে নির্বাচনের মাঠে নিয়ে এলো। ভেবেছিল বিএনপির নির্বাচন বর্জন করলেও নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করে ভোটারদের উৎসাহিত করা যাবে কেন্দ্রে আসতে। আরেকটি বিষয় নিশ্চিত হতে চেয়েছে যে, ২০১৪ সালের মতো কেউ যেন বিনা ভোটে এমপি হয়ে না যান।

কিন্তু এখন বড় মাথাব্যথার কারণ হয়েছে এ বিরোধ। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমাদানের পর থেকেই দেশের আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ভাঙচুরের ঘটনায় নির্বাচনী পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ বিরোধ আর কোন্দল একেবারে স্থায়ী হতে চলেছে প্রান্তিক পর্যায়ে।

সেটা না হয় দল বিবেচনা করবে নির্বাচনের পর বিরোধ কীভাবে মেটাবে। কিন্তু এখন যেভাবে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, খুন-খারাবি হচ্ছে তা যে কাউকেই ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। দলীয় কর্মী-সমর্থকরাই হয়ে পড়ছেন বিভ্রান্ত ও আতঙ্কিত। এক আওয়ামী লীগ প্রার্থী আরেক আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে যেভাবে হুমকি দিচ্ছেন, যে কদর্য ভাষায় কথা বলছেন, তা দেখে দলীয় কর্মীরা পড়েছেন সংশয়ে যে, তারা কোন পথে যাবেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনে সংঘাত, মারামারি বন্ধ করে জনগণের ভোটাধিকার নির্বিঘ্ন রাখতে দলীয় প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন কথা বলেছেন। কিন্তু এগুলো কোনো কাজে আসবে বলে মনে হচ্ছে না। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে গিয়ে দলীয় কোন্দল ও বিবাদ মাথাচাড়া দেওয়ায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো দূরের কথা, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনাগুলোকে সাধারণ সহিংসতা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। এমন সব কথাবার্তা উচ্চারিত হচ্ছে যাতে প্রতীয়মান হয় এ শত্রুতা বহু পুরোনো ও গভীর। প্রতিপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের হাত-পা ভেঙে দেওয়া, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট না দিলে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বিভিন্ন ভাতা বন্ধ করে দেওয়া, পক্ষে কাজ না করলে এলাকায় থাকতে না দেওয়া—এরকম হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও নৌকার বিরোধিতাকারীদের চিহ্নিত করে রাখতেও বলছেন অনেকে।

তিন মেয়াদে লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বহুদিন ধরেই দলের প্রান্তিক পর্যায়কে বিভাজিত করে রেখেছে। কান পাতলেই শোনা যায় টাকার বিনিময়ে দলীয় পদ বিক্রি, অযোগ্যদের পদ দেওয়া, স্বজনপোষণের এন্তার অভিযোগ। শাসক দলের নেতারা প্রায়ই একটা কথা বলেন, বিরোধী দলগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। আওয়ামী লীগই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দল। তারা এটাও বলতে ছাড়েন না যে, বড় দলের ভেতরে কোন্দল থাকবেই।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগবিহীন রাজনীতি করছেন শাসক দলের নেতারা। সেখানে তাই বিবাদ আর বিদ্বেষই রাজনৈতিক উপকরণ। নির্বাচনে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকে স্বতন্ত্রভাবে লাগিয়ে দেওয়ায় বিষোদগারের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ভোটের মাঠে মানুষের সমর্থনের চেয়ে পেশিশক্তির ব্যবহারই প্রদর্শনীয় হয়ে উঠেছে।

এ নির্বাচনটা আওয়ামী লীগের কাছে যত না নির্বাচন তার চেয়ে বেশি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা। সেভাবেই শুরু থেকে সবকিছু ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসছিল দলটি। বিএনপি ছাড়া নির্বাচন, সেটা আবার অংশগ্রহণমূলক এবং অবাধ করা, জাতীয় পার্টি, নিজের ১৪ দলের শরিক, নতুন সৃষ্ট পার্টি, আন্দোলনের মাঠ থেকে নির্বাচনের মাঠে আসা ব্যক্তি রাজনীতিক সবকিছুর ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নিজ দলকেই আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না আওয়ামী লীগ। এখানে কোনো ব্যবস্থাপনাই চোখে পড়ছে না।

কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন যে, নির্বাচন কমিশন কী করছে? আচরণবিধি মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য ভোটের মাঠে কাজ করছে কমবেশি ৮০০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এ ছাড়া প্রতিটি আসনে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে আছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। আইন অনুযায়ী, নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি কোনো অভিযোগ তদন্ত করে তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে প্রতিবেদন দেবে। এর ভিত্তিতে কমিশন ব্যবস্থা নেবে। তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় দু-একটি ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সতর্ক করেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে কারও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া অপরাধ। এ অপরাধ দুর্নীতির অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এর সাজা দুই বছর থেকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। এমনকি প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও আছে ইসির। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে ইসিকে কথা নয়, কাজে দেখাতে হবে। কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যায় করে পার পেয়ে গেলে প্রার্থী ও সমর্থকরা আরও বড় অন্যায় করতে উৎসাহী হবেন।

হানাহানি আর রাজনীতি সমার্থক হয়ে গেছে অনেকটা। এবারের ভোট অন্তত সেই চিত্রই দেখাচ্ছে। সমস্যা হলো—কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষরা সামগ্রিক সচেতনতার দিকে এগিয়ে না গিয়ে এই সহিংসতার স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছে নিজেদের। ভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও অস্থিরতা হচ্ছে, তার রেশ থাকবে ভোটের পরেও এবং সেটাই হবে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।

বিএনপি নির্বাচন করল না। করল না তাদের মিত্র দলগুলোও। তারা এ নির্বাচনে এগিয়ে এলে শান্তির বাতাবরণ হতো এমনটা নয়। তবে নির্বাচনের মাঠে রাজনীতি থাকত। যুক্তির বিরোধিতায়, চিন্তার বিরোধিতায় গণতান্ত্রিক লড়াই হতো। সেটা হলো না। এখন যা হচ্ছে তা ভোট নয়, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ভোটকে যুদ্ধ বানিয়ে ফেলেছেন নিজেদের মধ্যে।

এরপর যখন আমাদের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাবে পরিস্থিতি, তখন সেটা কী হবে সেই পরিণতির কথা কেউ ভাবছে বলে মনে হয় না। হয়তো সামাজিক অস্থিরতার পরিধি বেড়ে যাবে। এ যুদ্ধ হয়তো বছরের পর বছর ধরে লেগেই থাকবে। এতে করে সামাজিক অবক্ষয় আরও বিস্তৃত হবে। ব্যক্তি, দল নির্বিশেষে শুভচিন্তার উন্মেষের মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের, সম্প্রীতির বাতাবরণ বজায় থাকবে, সেই ভাবনাটাই আসছে না। তবুও বিশ্বাস করতে মন চায় যে, সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দেবে আমাদের রাজনীতি।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২০ বল করার জন্য ৩৪ হাজার কিলোমিটার উড়ে যাচ্ছেন অজি স্পিনার

সড়কে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব / যানজট নিরসনে ভুমিকা নেওয়ায় সুবিধাভোগীদের রোষানলে পুলিশ কর্মকর্তা

বালু উত্তোলনের লাইভ প্রচার করায় নির্যাতন

দেয়াল-পিলারে ফাটল, মেঝেও ধসে গেছে সৈয়দপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের

কাকরাইল রণক্ষেত্র, পুলিশি প্রটোকলে কার্যালয় ছাড়লেন জিএম কাদের

‘প্ল্যান-বি হলো জাতীয় পার্টির ওপর ভর করে লীগকে ফেরানো’

বরইতলা নদীকে গলা চেপে ধরেছে অপরিকল্পিত বাঁধ

নুরের ওপর হামলা, রাতেই বিক্ষোভের ডাক এনসিপির

রাকসু নির্বাচনে মনোনয়ন বিতরণ শেষ রোববার

ইউসিটিসিতে নবীন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠান

১০

হলুদ হেলমেট পরে হামলা করেছে কারা?

১১

মার্কিন শুল্ক ইস্যুতে বাংলাদেশ নিয়ে যা বললেন ভারতীয় সাংবাদিক

১২

‘জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে হামলা করেছে জাপা’

১৩

ভারতের দাপুটে জয়, সাফ শিরোপা হাতছাড়া বাংলাদেশের

১৪

গাজায় সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বিচার দাবি

১৫

অশুভ শক্তি দমনে ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে : কামাল হোসেন

১৬

জাপা কার্যালয়ের সামনে ফের হামলা, গুরুতর আহত নুর

১৭

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জমজমাট লড়াই : মিস করা যাবে না এই ১০ ম্যাচ

১৮

বে গ্রুপে আবেদন করুন, আর দুদিন বাকি

১৯

নারী সেজে কিশোরীকে ধর্ষণ করলেন মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তা

২০
X