আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতাসহ সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো বেশ কয়েকটি দেশ এডিস মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে সফল হলেও গত ২৩ বছরে আমরা এ রোগটি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। শুধু তা-ই নয়, দিন যত গড়িয়েছে, রোগটির প্রকোপ ও বিস্তার বেড়েছে এবং মৃত্যুসহ খারাপ পরিণতির শিকার হতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। গত ২২ বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সর্বশেষ এক বছরে তার চেয়ে বেশি মানুষ এ রোগে মারা গেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ডেঙ্গু পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান খারাপ দিকের এই যাত্রাকে থামানোর এবারও নেই যথাযথ প্রস্তুতি। ফলে এবারও যে তীব্রভাবে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি এবং হতাহতের শঙ্কা রয়েছে, তা সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে কালবেলার একাধিক প্রতিবেদন ও মন্তব্য প্রতিবেদনে।
শনিবার প্রকাশিত ‘এবারও ডেঙ্গুঝড়ের শঙ্কা, প্রস্তুতি কম’ শীর্ষক প্রধান প্রতিবেদন অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তন ও মশকনিধনে উদাসীনতার কারণে সারা বছরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এর ভয়াবহতা। প্রতি বছরই ভাঙছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ড। মশাবাহিত এ রোগটি সাধারণত বর্ষা মৌসুমে ছড়ানোর কথা থাকলেও এখন আর নির্দিষ্ট সময়ে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতি বছর বাড়ছে মশা মারার বাজেট। গতানুগতিক পদ্ধতিতে চলছে ‘লোক দেখানো’ নানা আয়োজন। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে না কিছুই। দুই সিটির আনুষ্ঠানিকতার বহরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে মশার উপদ্রব। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ মশা নিধনে আলাদা কর্মসূচি নিয়ে থাকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও ঢাকা উত্তর সিটির মশা মারার বাজেট প্রায় ১২২ লাখ টাকা। এর আগে মশা মারতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ড্রোন, রোড শো, পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মীদের শরীরে অত্যাধুনিক বডি ক্যামেরা সংযোজন করেছে। নানা সময়ে কাজে ব্যবহার করা হয়েছে হাঁস, পাখি, গাছ, মাছসহ বিভিন্ন উদ্যোগ। এর মধ্যে একাধিক উদ্যোগ হয়েছে সমালোচনা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রলের শিকার। তবে মশা বাগে আসেনি। উল্টো প্রতি বাজেটেই যুক্ত হয় বাড়তি খরচ। জনগণের টাকার এই শ্রাদ্ধ গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থায় জোর না দিয়ে মশার বংশবিস্তার ধ্বংস ও রোধ করার কথা বললেও বাস্তব চিত্রে দেখা যায় উল্টো। যেমন এখন এ বিষয়ে তৎপরতা সবচেয়ে বেশি, তা হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের পর তাদের চিকিৎসা নিয়ে। অর্থাৎ এটা এক রকমের নিশ্চিত, সিটি করপোরেশন বরাবরের মতোই তার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করতে পারেনি, আর এর ফল হিসেবে হাসপাতালগুলোয় বাড়বে বিশাল চাপ। সেই চাপ সামলানোই এখন একমাত্র কাজ, সেই অনুযায়ী সব তৎপরতা অর্থাৎ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সত্যিকারই পরিণত হয়েছে ‘ফাঁকা আওয়াজ’-এ। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এবার যেহেতু বৃষ্টি মৌসুম দীর্ঘ হতে পারে, আর তা হলে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঝুঁকি রয়েছে। ফলে এই লম্বা সময়ের জন্য কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই।
আমরা মনে করি, যেসব দেশ ডেঙ্গু মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে, বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশের কলকাতায় যে মডেল প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তা অনুসরণ করা যায় কি না, ভেবে দেখা উচিত। কেননা কলকাতার সঙ্গে আমাদের আবহাওয়াসহ বিভিন্ন দিকের মিল রয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে দুই সিটি করপোরেশনের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণসহ এবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।