

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দল অংশ নিলেও নির্বাচন করছেন না তিন দলের ছয় চেয়ারম্যান-মহাসচিবের পাঁচজনই। এর মধ্যে দুজন দলের চেয়ারম্যান ও তিনজন মহাসচিব। একই সঙ্গে নির্বাচন করছেন না দলগুলোর চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা সভাপতিরাও। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত তিন সুফিবাদী ইসলামিক রাজনৈতিক দল মিলে গঠন করা হয়েছে বৃহত্তর সুন্নি জোট। গত বছরের ৩০ আগস্ট জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) সমন্বয়ে ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ নামে নতুন রাজনৈতিক এ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনটি দলই মূলত চট্টগ্রামকেন্দ্রিক।
দলগুলোর মধ্যে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী নির্বাচন করছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর) আসন থেকে। বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভান্ডারী নির্বাচনের জন্য চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। প্রথমে যাচাই-বাছাইয়ে তথ্য ঘাটতির কারণে তার মনোনয়ন স্থগিত করা হয়েছিল। পরে সব তথ্য জমা দিলে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন, মহাসচিব সউম আবদুস সামাদ, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব জয়নুল আবেদিন জুবাইর ও সুপ্রিম পার্টির মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। তারা সবাই বিগত নির্বাচনগুলোয় নিজ নিজ দলের প্রার্থী হয়ে অংশ নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব আগের নির্বাচনগুলোয় চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসন থেকে নির্বাচন করলেও এবার এ আসনটি ছেড়ে দিয়েছেন তারই দলের এস এম শাহজাহানের কাছে। তিনি বয়সের কারণে এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না বলে কালবেলাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বয়স হয়ে গেছে। দলকে টিকিয়ে রাখতে, জোটকে টিকিয়ে রাখতে হলে তরুণ নেতৃত্বকে সুযোগ দিতে হবে। তাই জোটের বৈঠকে আমরা নির্বাচন না করে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলাম।’
এম এ মতিন ছাড়াও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না তার দলের মহাসচিব সউম আবদুস সামাদ। তিনি এর আগের নির্বাচনগুলোয় চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার একাংশ) আসন থেকে অংশ নিয়েছিলেন। এবার এ আসনে জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মাওলানা মোহাম্মদ সোলাইমান।
সউম আবদুস সামাদ বলেন, ‘জোট থেকে আমাকে নির্বাচন মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই নিজে নির্বাচন না করে সবার নির্বাচন সমন্বয় ও তদারকি করছি।’
জোটের আরেক শরিক দল ইসলামিক ফ্রন্টের মহাসচিব আল্লামা জয়নুল আবেদিন জুবাইরও এবারের নির্বাচন থেকে বিরত থাকছেন। তিনি এর আগে সবকটি নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসন থেকে এবং ২০২৪ এর নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। এবার এ আসনে জোটের প্রার্থী তারই দলের হাফেজ মাওলানা মো. আবু তাহের।
নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদিন জুবাইর কালবেলাকে বলেন, ‘বয়স হয়ে গিয়েছে, তাই এবার তরুণ নেতৃত্বকে জায়গা করে দিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।’ আগের নির্বাচনগুলোয় জামানত হারালেও এবার তরুণ নেতৃত্ব নতুন ভোটারদের কাছে টানতে পারবে বলে তিনি আশাবাদী। আল্লামা জুবাইর বলেন, ‘পরিস্থিতি এখন অনেক পাল্টে গেছে। তরুণ ভোটারদেরও আমরা বিবেচনায় রেখেছি।’
অন্যদিকে নির্বাচন না করার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন টাকার অভাবে প্রার্থী হতে পারেননি বলে কালবেলাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার এলাকার ভোটাররা আমার জন্য কান্নাকাটি করছেন। তারা কেউ বলছেন গরু বিক্রি করে টাকা দেবেন, কেউ বলছেন জায়গা বিক্রি করে টাকা দেবেন। কিন্তু সেটার ওপর তো ভরসা করা যায় না। তাই নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম নিইনি।’
দলগুলোর চেয়ারম্যান-মহাসচিবরা ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের একতরফা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন। জুলাই আন্দোলনের পরে দলের কর্মী ও তরুণ নেতৃত্বের কাছে তারা প্রশ্নের মুখে পড়েন। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনগুলোর ছাত্রপ্রতিনিধি থেকেও তাদের বয়কটের আলোচনা ওঠে। তাই বিতর্ক এড়াতে দলগুলোর চেয়ারম্যান-মহাসচিবরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না বলে আলোচনা রয়েছে। তবে, দুই দলের ঊর্ধ্বতন নেতারা সে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন, তরুণ নেতৃত্বকে এগিয়ে আনতেই নির্বাচন থেকে বিরত থাকছেন তারা।
তবে ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি এইচ এম মুজিবুল হক শাকুর এ বক্তব্য অস্বীকার করে বলেছেন, ‘যার যার ব্যক্তিগত কারণে তারা নির্বাচন করছেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অনেকবার নির্বাচন করেছি। এবার নির্বাচন করাচ্ছি। কার্যক্রম তদারকি করছি।’
এর আগে গত বছরের ২৪ নভেম্বর বৃহত্তর সুন্নি জোটের পক্ষ থেকে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের সবকটি সংসদীয় আসনে প্রার্থী দেওয়া বলে জানিয়েছিলেন সুফিবাদী সংগঠন বাংলাদেশ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সচিব ও ইসলামী বক্তা গিয়াস উদ্দিন তাহেরী।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতকে দেশের একমাত্র অহিংস শান্তিপ্রিয় দল হিসেবে উল্লেখ করে তাহেরি তখন জানিয়েছিলেন, তাদের দলের সহিংসতার কোনো রেকর্ড নেই। ন্যায় ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বৃহত্তর সুন্নি জোটের পক্ষ থেকে দেশের ৩০০ আসনেই প্রার্থী নিশ্চিত করা হবে।
তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭০টি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে তিন দলের সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর সুন্নি জোট। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা জয়নুল আবেদিন জুবাইর এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব শাহ মোহাম্মদ আসলাম হোসাইন।
মন্তব্য করুন