ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে গত বছরের ৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজারের আদর্শ হকার্স মার্কেটের দোকানদার আমিনুল ইসলাম পাটোয়ারীর ১০ লাখ টাকার মালপত্র পুড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত এ ব্যবসায়ী এখন নির্মাণ হতে যাওয়া ১০তলা বিশিষ্ট বঙ্গবাজার নগর পাইকারি বিপণিবিতানে একটি দোকানের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমার মতো দোকান মালিক যারা বঙ্গবাজারের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য একটি আধুনিক শপিংমলে জায়গা পাওয়া স্বপ্নের মতো। গত বছরের অগ্নিকাণ্ডের পর আমি ভেবেছিলাম, আমি কিছুই পাব না।’
নতুন মার্কেটে জায়গা নিশ্চিত করতে একজন দোকান মালিককে চলতি মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) তিন লাখ টাকা জমা দিতে হবে। এ যাত্রায় আমিনুল একা নন। অগ্নিকাণ্ডে দোকান হারানো ২ হাজার ৯৬১ মালিক নতুন মার্কেটে জায়গা বরাদ্দ পাবেন। আজ বঙ্গবাজারে গিয়ে বিপণিবিতান নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ছাড়া আরও তিনটি প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন সরকারপ্রধান।
বঙ্গবাজারের নিউ কালেকশন দোকানের মালিক ইমন আহমেদ বলেন, বলতে গেলে অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীরা সবাই পথে বসে গেছেন। এ অবস্থায় নতুন বহুতল ভবনের কাজ শুরু হওয়ার খবর অবশ্যই আমাদের জন্য আনন্দের। আমাদের দাবি একটাই, যারা এখানেই ব্যবসা করে আসছেন সারা জীবন ধরে, তারাই যেন মার্কেটে দোকান বরাদ্দ পান।
টপ কালেকশন নামে আরেক দোকানের মালিক জব্বার মিয়া বলেন, আমরা প্রত্যেক ব্যবসায়ী চাই যেন মার্কেট নির্মাণের পর বঙ্গবাজারে সেই আগের বেচাকেনা, ব্যবসা ফিরে আসে। শুনেছি আধুনিক মার্কেট হবে, তাতে আশা করছি আমাদের আগের ব্যবসা ফিরে আসবে। তবে সিটি করপোরেশনের কাছে অনুরোধ, যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই মার্কেটের দোকান বরাদ্দ পান। এখানে যেন কোনো অসাধু চক্রের খপ্পর না থাকে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের ছাড়া বহিরাগতদের যেন প্রাধান্য দেওয়া না হয়।
বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম বলেন, আমরা খুবই আনন্দিত যে, বঙ্গবাজার মার্কেট ভবনের কাজ শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সেটি উদ্বোধন করবেন। নির্মাণ শুরু করতে যে তহবিল দরকার, তা সিটি করপোরেশনের কাছে এরই মধ্যে রয়েছে। বঙ্গবাজারে অস্থায়ী দোকান বরাদ্দের সময় দোকান মালিকরা আগে ১ লাখ টাকা করে জমা দিয়েছিলেন। আর এই আমানত এখন ৪২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রত্যেক দোকান মালিক ৩ লাখ টাকা জমা দেওয়ার চিঠি পেয়েছেন।
ডিএসসিসি সূত্র বলছে, ১০৬.২৮ কাঠা জমির ওপর ১০তলা বিশিষ্ট বঙ্গবাজার নগর পাইকারি বিপণিবিতানে পাঁচটি সাধারণ সিঁড়ি, ছয়টি অগ্নি প্রস্থান সিঁড়িসহ পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকবে। বিপণিবিতানের প্রতিটি ব্লকের জন্য আলাদা বাহির ও প্রবেশদ্বার থাকবে। ভবনে বৈদ্যুতিক যান্ত্রিক কক্ষ এবং প্রতিটি ব্লকের প্রতি তলায় চারটি করে শৌচাগার থাকবে। এ ছাড়া ভবনের ভূমিতলে ১৬৯টি গাড়ি ও ১০৯টি মোটরসাইকেল পার্কিংয়ের সুবিধা থাকবে। প্রতি তলায় ২৫০ বর্গফুটের ফুড কোর্ট এবং আলাদা টয়লেট ব্লকও থাকবে। নির্মিতব্য বঙ্গবাজার নগর পাইকারি বিপণিবিতানে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৯৬১ জনের সবাইকে পুনর্বাসন করা হবে। পুড়ে যাওয়া মার্কেটে ব্যবসায়ীরা আগে ১৭ থেকে ২২ বর্গফুট আয়তনের দোকানে ব্যবসা পরিচালনা করতেন। নতুন বিপণিবিতানে প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১২০ বর্গফুট। প্রতি বর্গফুটে ৫ হাজার ৫শ টাকা খরচে আনুমানিক ৩৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ের মার্কেটটির নির্মাণকাজ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষের কথা রয়েছে।
বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, মহানগর এবং আদর্শ হকার্স মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের জন্য ২ হাজার ৯৬১টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। এতে অতিরিক্ত ২৪৪টি দোকান থাকবে যা নিয়ম অনুযায়ী একটি আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী বলেন, দোকান বরাদ্দের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের। বাকি দোকানগুলো একটি খোলামেলা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে। দোকানের থেকে বেশি আবেদন আসলে লটারি করা হবে।
আরও তিন প্রকল্পের উদ্বোধন: পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে রায়েরবাজার স্লুইসগেট গেট পর্যন্ত আট সারির ইনার সার্কুলার রিং রোডের নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। ৯৭৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পের আওতায় ১০ কিলোমিটার নর্দমা, ১০ কিলোমিটার পথচারী হাঁটার পথ, তিনটি ভেহিক্যাল ওভারপাস, তিনটি পথচারী পারাপার সেতু, দুই কিলোমিটার সংরক্ষণকারী দেয়াল, তিনটি মসজিদ, ছয়টি যানবাহন বিরতির স্থান ও ছয়টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হবে। এতে ঢাকা শহরের ভেতরে বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি বহুলাংশে যানজট নিরসন হবে বলে মনে করছে ডিএসসিসি।
নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ধানমন্ডি লেকে নজরুল সরোবর নির্মাণ করছে ডিএসসিসি। আজ এই কাজেরও উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে ‘নজরুল সরোবর’ নামের উন্মুক্ত বিনোদন মঞ্চে একটি ঘাটলা, উন্মুক্ত মিলনায়তন, পথচারীদের হাঁটার পথ, গণপরিসর, রেস্তোঁরা, বসার স্থান, দৃষ্টিনন্দন বাতি, পর্যাপ্ত সবুজায়ন ও শব্দযন্ত্র স্থাপনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নজরুল ইসলামের স্মৃতিময় মুহূর্ত ও সাহিত্যকর্ম-সংবলিত ফলক স্থাপন করা হবে বলে দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া শাহবাগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজেরও উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শাহবাগে জিয়া শিশু পার্কের নতুন নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশু পার্ক করা হয়েছে। প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই শিশু পার্কের আধুনিকায়নের কাজ করা হবে। আগে এই পার্কে ১১টি রাইড ছিল। সেখানে ১৫টি অত্যাধুনিক রাইড বসানো হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির মুখপাত্র ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ভাগ হওয়ার পর এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের চারটি উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করতে আসছেন। এই চার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকাবাসীর জীবনমান বৃদ্ধি পাবে।