বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল বিভাগের জেলা ভোলায় প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস। তবে ৩ হাজার ৪০৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জনপদের চারপাশে শুধু অথৈ পানি, যা ভোলাকে পরিণত করেছে দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলায়। দেশের বাকি অংশে যখন যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বিপ্লব ঘটছে, তখনো ভোলা দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন রয়ে গেছে। ভোলার ইলিশা নদীঘাট থেকে সবচেয়ে কাছের জেলা বরিশালের মহাসড়কের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার। স্বাভাবিক গতিতে নদীপথে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় লাগে অন্তত দুই ঘণ্টা ২৮ মিনিট। ফলে মুমূর্ষু রোগীর উন্নত চিকিৎসা কিংবা স্বজনের টানে ঘরে ফেরা—ভোলাবাসীর কাছে সবই যেন এক কঠিন পরীক্ষা।
তবে ভোলাবাসীর এই দুঃখ ভোলাতে পারে একটি সেতু। বরিশাল-ভোলার মধ্যে সম্ভাব্য এই সেতু হলেই বাংলাদেশের সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে ভোলা, যা এই জেলার মানুষের যাতায়াতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ভোলাকে দেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত করার ভাবনা অবশ্য বেশ পুরোনো। তবে বরিশাল ও ভোলার মধ্যে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৩ সালে, যা ২০১৯ সালের দিকে শেষ হয়। এরপর অর্থায়নের অভাবে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি সেই সেতু নির্মাণে।
গত মার্চে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ) একটি প্রতিনিধিদল জাপান সফর করে। সেখানে অনেকগুলো প্রকল্পের মধ্যে বরিশাল-ভোলা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গও ওঠে আলোচনায়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। এখনো জাপানের পক্ষ থেকে কোনো জবাব আসেনি। অন্যদিকে, পরিকল্পনা কমিশনের আওতাধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমেও সেতু নির্মাণে অর্থের সন্ধান করছে সরকার।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, বর্তমান সরকার এই সেতু নিয়ে ইতিবাচক রয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে ডিজাইনের (নকশা) কাজ শুরু হবে। এতে প্রায় এক বছর লাগবে। তারপর ভূমি অধিগ্রহণেও এক বছর যাবে। পিপিপিতে কাজটা হবে নাকি ঋণ করতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও এই সময়ের মধ্যে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের হাতে এত সময় নেই। তবে আমরা কাজটা শুরু করে দিয়ে যেতে চাই। ডিজাইনের কাজ শুরু হলে পরবর্তী সরকার কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
চিন্তাভাবনা করতে করতেই সম্ভাব্য ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণ: বরিশাল ও ভোলার মধ্যে সম্ভাব্য সেতু নির্মাণের বিষয়টি এখনো চিন্তাভাবনার পর্যায়েই রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ ৯ হাজার ৯২২ কোটি টাকা থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা হয়ে গেছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পরই মূল খরচ নির্ধারণ করা হবে। প্রকল্পটি যদি পিপিপিতে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে খরচ নির্ধারণ করবে বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর যদি ঋণের আওতায় হয়, তাহলে ঋণদাতা সংস্থা ও সরকার মিলে ব্যয় নির্ধারণ করবে।
বিবিএ সূত্র বলছে, সেতু নির্মাণের জন্য জরিপ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে সেতুর সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বরিশালের লাহারহাট ফেরিঘাট থেকে ভোলার ভেদুরিয়া ফেরিঘাট বরাবর জায়গাকে প্রাথমিকভাব ঠিক করা হয়েছে। প্রায় ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সম্ভাব্য এই সেতুর প্রায় তিন কিলোমিটার যাবে শ্রীপুর চরের ওপর দিয়ে।
সেতুর সম্ভাব্যতা জরিপে বলা হয়, সেতুর কাজ শেষ হলে ভোলা এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারীদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নতি হবে। সেতু প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামছুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘পিপিপি পদ্ধতিতে সেতুর কাজ করা গেলে খরচ সীমিত রাখা সম্ভব হবে। তবে এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে হবে। প্রকল্পের জমি আগেই অধিগ্রহণ করতে হবে। এর জন্য আলাদা সাপোর্ট প্রজেক্ট নেওয়া যেতে পারে। পিপিপিতে হলে ২৫-৩০ বছর একটা ভালো রক্ষণাবেক্ষণ পাওয়া যাবে। আমরা নির্মাণ করতে পারি, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারি না।’
সেতু হলে ভোলার গ্যাস আসবে সহজে: ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানিয়েছিলেন, ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্রের প্রায় ৩২ কিলোমিটার উত্তরে ভেদুরিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে। নতুন করে গ্যাসের সন্ধান পাওয়ার পর ভোলার গ্যাসের রিজার্ভ দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুটে।
বিবিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী মো. ফেরদাউস কালবেলাকে বলেন, ‘বরিশাল ও ভোলার মধ্যে বহুমুখী সেতু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সেতু দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিবহনের সুযোগ থাকবে। এতে ভোলার গ্যাস সহজে আনা যাবে।’
নদীপথে বরিশাল থেকে ভোলার ভেদুরিয়া যেতে লঞ্চে প্রায় দুই ঘণ্টা এবং স্পিডবোটে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো লাগে। ভেদুরিয়া থেকে ভোলা সদর উপজেলায় যেতে লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। সেতুর সম্ভাব্যতা জরিপের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়, ভোলা থেকে যাত্রী এবং পণ্য পরিবহন নৌকা ও লঞ্চের ওপর নির্ভরশীল, যা এই জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রভাব ফেলছে।
অর্থায়নের খোঁজ চলছে: কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত জাপান যদি অর্থায়ন না করে, সে ক্ষেত্রে বিকল্প অর্থায়নের খোঁজ চালানো হচ্ছে। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে চীন আগ্রহী বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া সবকিছু ঠিক থাকলে দক্ষিণ কোরিয়াও অর্থায়নে আগ্রহী বলে জানা গেছে।
সেতুর সঙ্গে সড়কও হবে, মূল ভূখণ্ডে মিলবে ভোলা: প্রকল্পের প্রাথমিক ভাবনায় ১০ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার সেতুর সঙ্গে আরও প্রায় ছয় কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেতুর প্রতিটি স্প্যান হবে ২০০ মিটারের। চার লেনের এই সেতুর প্রস্থ হবে ২০ দশমিক ২৫ মিটার। সেতুর দুই পাশে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের সংযোগ সড়ক তৈরি হবে। চার লেনের মূল সড়কের দুই পাশে দুটি পার্শ্ব সড়ক (সার্ভিস লেন) থাকবে। সব মিলিয়ে সড়কের প্রস্থ হবে সাড়ে ৩৯ মিটার। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৫০৭ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে।
মন্তব্য করুন