মিনহাজ তুহিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৫, ১০:১৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বছরে ১৪২ কোটি টাকার পানি যাচ্ছে পানিতে

চট্টগ্রাম ওয়াসা
চট্টগ্রাম ওয়াসা ভবন। ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রাম ওয়াসা ভবন। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগরীর মিমি সুপার মার্কেটের পাশ দিয়ে যেতে চোখ আটকে যায় একটি ভবনের সামনে। ভবনটির সামনের রাস্তা দিয়ে অঝোরে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ পানির ধারা। দূর থেকে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, কোনো ঝরনা থেকে যেন বয়ে আসছে এই পানি। তবে কাছে যেতেই ভাঙে ভুল। এটা মূলত চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপলাইন ফুটো হয়ে বের হয়ে আসা পানির নহর (জলধারা)। এলাকাবাসী জানান, অন্তত তিন সপ্তাহ এভাবে ওয়াসার পাইপলাইন থেকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা অঝোরে পানি বের হয়ে আসছে। প্রতিকার চেয়ে তিন দফায় বিষয়টি ওয়াসাকে জানানো হয়, তবে কোনো সাড়া মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে গত সোমবার সকালে ওয়াসিফ সাদমান নামে এক যুবক ওই ‘জলধারার’ ভিডিওচিত্র ধারণ করে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিলে সিটি মেয়রও তা শেয়ার করেন। আর এরপরই টনক নড়ে ওয়াসার, রাতেই তড়িঘড়ি করে মেরামত করা হয় ফুটোটি।

একই চিত্র দেখা যায়, নগরীর হালিশহরের ছদু চৌধুরী সড়কে। বাসস্ট্যান্ড থেকে বছির শাহ মাজারের দিকে যেতে সেতুর নিচে অঝোরে ঝরতে দেখা যায় পানি। এলাকাবাসী জানান, দুই মাসের বেশি সময় এভাবে পানি অনবরত বয়ে চলেছে। ওয়াসাকে দফায় দফায় জানানোর পরও প্রতিকারের কোনো পদক্ষেপ নেই।

শুধু এ দুই জায়গাই নয়, নগরীর প্রায় প্রতিটি এলাকায় এভাবে পাইপ ফুটো হয়ে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে পৌনে দুই কোটি লিটারেরও বেশি পানি। বছরে যা দাঁড়ায় সাড়ে ৬০০ কোটি লিটারের মতো। যার বাজারমূল্য ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আবার এসব ফুটো মেরামত করতে বছরে ব্যয় হয় কোটি টাকার বেশি। এ ছাড়া গত এক বছরের হিসাব থেকে দেখা যায়, বিভিন্ন কারণে ওয়াসার মোট উৎপাদিত পানির গড়ে সাড়ে ২৬ শতাংশই হাওয়া হয়ে যায়।

বিশাল অঙ্কের এ অপচয় কমাতে ওয়াসার তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহক, বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিক সমাজের নেতারা। তারা বলছেন, এ অপচয় বন্ধ করতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা নেই। তাদের দাবি, সংস্থাটি তৎপর হয়ে এ অপচয় বন্ধ করলে নগরজুড়ে পানির হাহাকার কিছুটা হলেও কমানো যেত।

বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার আবাসিক গ্রাহক সংযোগ আছে ৮৬ হাজার ৪৭টি এবং বাণিজ্যিক সংযোগ ৮ হাজার ৫১১টি। ওয়াসার দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে দৈনিক ৪৬ কোটি লিটারের মতো পানি উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ পানি হালদা ও কর্ণফুলী নদী থেকে নিয়ে পরিশোধন করা হয়। বাকি ৮ শতাংশ পানি আসে গভীর নলকূপ থেকে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত পানির মধ্যে পাইপে ফুটোর কারণে প্রতিদিন নষ্ট হয় ১ কোটি ৭৮ লাখ লিটার। এভাবেই বছরে সাড়ে ৬০০ কোটি লিটার পানি হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। ওয়াসার হিসাবে এক হাজার লিটার পানি উৎপাদন করতে সংস্থাটির খরচ হয় ৩২ টাকা। পানি পরিশোধনে ব্যবহৃত রাসায়নিক, বিদ্যুৎ খরচ, জনবলের বেতন-ভাতা অন্তর্ভুক্ত করে এ উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে ৬৪০ কোটি লিটার পানি উৎপাদনে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

পাইপলাইনে ফুটোর কারণে পানির অপচয় রোধ করা গেলে নগরের বড় একটি অংশে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যেত বলে মনে করেন ওয়াসার প্রকৌশলীরা। বিশেষ করে নগরীর বগার বিল শান্তিনগর বাজার সংলগ্ন এলাকা, আমিন হাজি রোড, বেলাখান বাড়ী, রাজাপুকুর লেইন, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ কাট্টলী, ফৌজদারহাট, পোস্তারপাড়, দক্ষিণ হালিশহর, মধ্যম হালিশহর, পাহাড়তলী, আমবাগান ফ্লোরাপাস রোড, দক্ষিণ খুলশী একাংশ, পশ্চিম খুলশী জালালাবাদ, চন্দ্রনগর, মোজাফফর নগর, অক্সিজেন শীতল ঝরনা আবাসিক এলাকায় পানি সরবরাহ সম্ভব হতো।

ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আবাসিকে এক হাজার লিটার পানির দাম ১৮ টাকা, বাণিজ্যিকে ৩৭ টাকা।

সংস্থাটির গত এক বছরের এমআইএস প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ওয়াসার উৎপাদিত সাড়ে ২৬ ভাগ পানি গ্রাহকের কাছে পৌঁছায় না। যার পরিমাণ গড়ের হিসাবে দিনে ১২ কোটি ১৯ লাখ লিটার, যা বছরে দাঁড়ায় ৪৪৪৯ কোটি ৭০ লিটার। এর বাজারমূল্য ১৪২ কোটি ৩৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা। এই পানির কোনো বিল আদায় হয় না। কাগজে-কলমে এটিকে রাজস্ববিহীন পানি বা কারিগরি অপচয় বলা হয়। সাড়ে ২৬ ভাগের মধ্যে ৩ দশমিক ৯ ভাগ ফুটোর কারণে নষ্ট হয়। বাকি পানি চুরি, অবৈধ সংযোগ, মিটারে কারসাজির মাধ্যমে নষ্ট হয় বলে জানিয়েছেন ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী।

১৯৬৩ সালে যাত্রা শুরু করা ওয়াসা বর্তমানে ১ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে নগরজুড়ে পানি সরবরাহ করে। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ৭০০ কিলোমিটার পাইপলাইন নতুন করে বসানো হয়েছে। বাকি লাইন এখনো পুরোনো। তবে নতুন ও পুরোনো দুই পাইপলাইনেই ফুটো আছে বলে জানা গেছে।

ওয়াসার পাইপলাইনে বছরে ফুটোর পরিমাণ, মেরামত বাবদ খরচসহ বিভিন্ন তথ্য জানতে গত জুলাই মাসে ওয়াসায় তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হয়। পরে সংস্থাটি লিখিতভাবে জানিয়েছে, গত এক বছরে পাইপে ২ হাজার ১৩৯টি ফুটো হয়েছে।

ফুটোর কারণে নষ্ট পানির জন্য কোটি টাকা গচ্চার পাশাপাশি মেরামত করতেও গুনতে হচ্ছে কোটি টাকা। ফুটো মেরামতে গত এক বছরে খরচ হয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা।

পানির অপচয় রোধে ওয়াসার সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ত্রুটির সহনীয় একটা সীমারেখা আছে। সেটা আমরা কম-বেশি ৫ শতাংশ পর্যন্ত মেনে নিতে পারি। কিন্তু সেটা যদি সাড়ে ২৬ শতাংশ হয়, তাহলে এটা অশনিসংকেত। রাজস্ববিহীন পানি যে সাড়ে ২৬ শতাংশ বলা হচ্ছে, এর মাধ্যমে চোরাই লাইন, অবৈধ সংযোগের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই বিশাল পরিমাণ অপচয়ের দায়ভার কে বহন করছে? এটা বিভিন্ন সময় পানির দাম বৃদ্ধি করে গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। আমরা সবসময় এ বিষয়ে সোচ্চার থাকি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজস্ববিহীন পানির পরিমাণ কীভাবে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা যায়, এ বিষয়ে ওয়াসাকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি কত সময়ের মধ্যে এটা সম্ভব হবে, তাও জানাতে হবে। এভাবে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় বন্ধ করতে হবে।’

খাতা-কলমে একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হলেও চট্টগ্রাম ওয়াসাকে ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যা দেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘ওয়াসা একটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হলেও এটি একটি অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ প্রতিষ্ঠান। পানি উৎপাদন এবং সরবরাহের ক্ষেত্রে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজেট থাকে, সেটা উৎপাদন থেকে পরবর্তী সেময়ে রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে একটি লুটপাটের কর্মযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়। ওয়াসার এসব বিষয়ে কোনো জবাবদিহি নেই। জবাবদিহি চাওয়ারও কেউ নেই। যারা দেখার তারা নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত। ফলে ওয়াসার এসব বিষয়ে আশ্চর্যান্বিত হওয়ারও কিছু নেই। ওয়াসাকে জনমুখী প্রতিষ্ঠান করতে হলে আগাগোড়া পুরোটাই সংস্কার করতে হবে।’

বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, ‘কিছু পানির রাজস্ব বিভিন্ন কারণে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে পাইপ ফুটো হওয়া, অবৈধ সংযোগ, মিটার রিডিং উল্লেখযোগ্য। আমরা রাজস্ববিহীন পানি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে কাজ করছি। এরই মধ্যে ৩ হাজার স্মার্ট মিটার বসানো হয়েছে। আর লিকেজ কমাতে ৭০০ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩৮৩ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন বসানোর কাজ চলছে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মনোয়ারা বেগমের অফিসে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মোবাইল ফোনে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

খালেদা জিয়াকে ৫ বছর সাজা দেওয়া বিচারপতি আখতারুজ্জামানের পদত্যাগ

২৮ বছর পর সন্তানকে ফিরে পেলেন বাবা-মা

বিশ্বের দ্বিতীয় ক্রিকেটার হিসেবে যে মাইলফলক স্পর্শ করলেন পোলার্ড

আইএসপিআরের বিবৃতি প্রত্যাখ্যান গণঅধিকার পরিষদের 

সমালোচনার মুখে ইব্রাহিম, জবাব দিলেন জেরিন

‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েছে’

প্রিয়া মারাঠে আর নেই

ছুরিকাঘাতে প্রাণ গেল যুবকের

পলিথিন-প্লাস্টিকের ব্যাগ পেলেই ব্যবস্থা, হুঁশিয়ারি পরিবেশ উপদেষ্টার

উপহার পাঠিয়ে খোঁজ নিলেন রুমিন ফারহানা, কী বললেন হাসনাত

১০

সেলফির পেছনে মৃত্যু: শীর্ষে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র

১১

চবিতে ফের সংঘর্ষ, উপ-উপাচার্যসহ আহত ২০

১২

বিকেলে নয়, সন্ধ্যায় বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে বসবেন প্রধান উপদেষ্টা 

১৩

নতুন আরও এক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে নাম লেখালেন সাকিব

১৪

‘সাইয়ারা’র নায়কের আসল নাম কী?

১৫

স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে মাসুদ গ্রেপ্তার

১৬

আ.লীগ নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

১৭

গাছ চুরির তথ্য সংগ্রহে গিয়ে হামলার শিকার ২ সাংবাদিক

১৮

চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে বৃদ্ধ নিহত

১৯

বিক্ষোভে উত্তাল ইন্দোনেশিয়া, চীন সফর বাতিল প্রেসিডেন্টের

২০
X