

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ) ও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আঁচ লেগেছে সীমান্তের এপারের বাংলাদেশ অংশেও। গতকাল রোববার সকালে কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছে বাংলাদেশি এক শিশু। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তার চিকিৎসা চলছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। একই সময় গুলিবিদ্ধ হন আরও একজন।
অন্যদিকে রাখাইনের চলমান সংঘাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে অনুপ্রবেশের পর মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫৩ সদস্যকে আটক করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গতকাল সকাল থেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় তাদের আটক করা হয়।
বিজিবি জানায়, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের মুখে টিকতে না পেরে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। এ ছাড়া এক বাংলাদেশিকেও আটক করা হয়েছে। পরে বিকেলে তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে আরাকানে সংঘর্ষের প্রভাব পড়েছে টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদেও। ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণের শব্দে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত হোয়াইক্যং সীমান্তের কাছে একের পর এক গোলার বিস্ফোরণ এবং শত শত রাউন্ড গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে এপারের বাড়ি-ঘর কেঁপে ওঠে এবং ছোড়া গুলি চিংড়ি ঘের ও চাষের জমিতে এসে পড়ে। এতে নারী ও শিশুরা ভয়ে কেঁদে কেঁদে ওঠেন। রাতের পর দিনের বেলায়ও মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।
হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম হুজাইফা সুলতানা আফনান (৯)। সে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে জানা গেছে। গুলিতে আহত হওয়ার পর শিশুটি মারা গেছে—প্রথমে এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে পাঠান চমেক হাসপাতালে। একই সময় আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গুলিবিদ্ধ শিশুটির চাচা শওকত ও টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।
যদিও ঘটনার পরপর সকালে ওসি সাইফুল ইসলাম বলেছিলেন, সীমান্তবর্তী হোয়াইক্যং এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে কাজ করছে। গুলির উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গুলিটি মিয়ানমার দিক থেকে এসেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কারা এই গুলি ছুড়েছে, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।’
শিশুর মৃত্যুর এই খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে হোয়াইক্যং এলাকায় স্থানীয়রা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল এবং উখিয়া-টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষুব্ধ জনতাকে সান্ত্বনা দেওয়ার পর তারা অবরোধ তুলে নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং মিয়ানমার জান্তার মধ্যে গত কয়েকদিন ধরে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। ওই সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় সীমান্ত এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আরাকান আর্মির সঙ্গে আরসা, আরএসও ও নবী হোসেন গ্রুপের তীব্র গোলাগুলি চলছে।
গতকাল সকালে হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় সরেজমিন নাফ নদের বিলাইছরি ও হাসরদ্বীপে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়তে দেখা যায়। এলাকাবাসী জানায়, শনিবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত সীমান্তে গুলি বিনিময় হয়। সকালের দিকে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় আরাকান আর্মি। হামলায় টিকতে না পেরে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা পিছু হটলে আরাকান আর্মি তাদের তাড়া করে বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বেড়িবাঁধ পর্যন্ত চলে আসে এবং এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে।
আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে লম্বাবিল এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে খেলার সময় শিশু হুজাইফা সুলতানা আফনান গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। সে স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোছন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী।
আহত শিশুর বাবা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে হুজাইফা বাড়ির সামনে খেলছিল। হঠাৎ আরাকান আর্মি বেড়িবাঁধের ওপর থেকে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে আমার মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার কান বরাবর গুলি লাগে।’
চমেক হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া ও আইসিইউ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক হারুন অর রশিদ গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে জানান, শিশু হুজাইফার অবস্থা গুরুতর। তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। গুলি তার মুখের এক পাশ দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ আলম বলেন, ‘শনিবার রাত থেকে আরসা ও আরাকান আর্মির প্রচুর গোলাগুলি হয়। একপর্যায়ে আরসার সদস্যরা আরাকান আর্মির তাড়া খেয়ে এপারে চলে আসে। আমরা খুবই অনিরাপদ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি।’
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, ‘সীমান্তে কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি থমথমে। সীমান্তের অনেক বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে।’
সীমান্তের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ৫০ সদস্যকে আটক করে হেফাজতে নেয় বিজিবি ও পুলিশ। তাদের মধ্যে ৩-৪ জন গুলিবিদ্ধ ছিল। এ সময় আটক করা হয় দুই রোহিঙ্গাকে। তারা কাঁকড়া শিকারে গিয়েছিল। আটকদের মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির ৩ জন, রোহিঙ্গা ইসলামী মাহাসের ১৮ জন এবং আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির (এআরএ) ২৯ জন রয়েছে। বিজিবির কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ ৫৩ জনকে হেফাজতে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গতকাল দুপুরে হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ খোকন কান্তি রুদ্র কালবেলাকে বলেন, ‘আরসাসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৫০ জন সদস্যকে হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাদের টেকনাফ মডেল থানায় সোপর্দ করা হবে।’
মন্তব্য করুন