

কারখানার অবকাঠামো স্থাপনে কেবলই চলছে মাটি ভরাটের কাজ, নির্মিতব্য সেই কারখানায় এরই মধ্যে গ্যাস সংযোগের অনুমোদন দিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। অথচ তার পাশেই সচল কারখানার সব ধরনের কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও গ্যাস সংযোগের আবেদন বাতিল করা হয়েছে। এ চিত্র দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দ্বীপ জেলা ভোলার। তবে শুধু ভোলাতেই নয়, একইভাবে দেশের অন্যান্য জায়গাতেও শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত বা চালু কারখানায় অগ্রধিকার দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা মানছে না জ্বালানি বিভাগ। উল্টো নিজেদের নির্দেশনা নিজেরাই ভঙ্গ করছে। জ্বালানি বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে পাওয়া নথিপত্র বিশ্লেষণ করে এমনটিই দেখা গেছে।
আবাসিকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ এক যুগ ধরে। চালু রয়েছে শুধু শিল্প প্রতিষ্ঠানে সংযোগ। সেই সংযোগ ঘিরে ‘বাণিজ্য’র বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই ‘ওপেন সিক্রেট’। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিল্পে গ্যাস সংযোগের হর্তাকর্তা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী। উপদেষ্টার কমিটির সুপারিশ ছাড়া কোনো সংযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। আওয়ামী লীগের পতনের বছরখানের আগে সেই কমিটি বাতিল করা হলে ক্ষমতা ফিরে পায় বিতরণ কোম্পানিগুলোর বোর্ড। সরকার পরিবর্তনের পরও সেই পদ্ধতি চালু ছিল। ২০২৫ সালের ১৮ জুন এক অফিস মাধ্যমে আবার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
ওই আদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব (অপারেশন) ড. রফিকুল আলমের (বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব, কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে শিল্প ও ক্যাপটিভ গ্রাহকের নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির আবেদন যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত জ্বালানি বিভাগ থেকে জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, শুধু যেসব শিল্পকারখানা উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে, গ্যাস পেলে দ্রুত কারখানা চালু করতে পারবে, তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে সংযোগ দেওয়া হবে।
জানা গেছে, গ্যাস সংযোগে বিতরণ কোম্পানি এবং পেট্রোবাংলার সুপারিশের পরও আবেদন বাতিল করছে জ্বালানি বিভাগ। সব ধরনের কাগজপত্র থাকার পরও ভোলায় মেসার্স জারিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের গ্যাস সংযোগের আবেদন বাতিল করে দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। অথচ তার পাশেই দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় শিল্প গ্রুপের অধীন কোম্পানির নির্মাণাধীন কারখানায় গ্যাস সংযোগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ কারখানার জায়গায় কেবলই মাটি ভরাটের কাজ চলছে। অন্যদিকে, জারিয়ান ফুড প্রোডাক্টস একটি চালু কারখানা, বিকল্প উপায়ে উৎপাদনে রয়েছে। বিতরণ কোম্পানি এবং পেট্রোবাংলার রিপোর্টে বলা হয়েছে, সেখানে গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতার তুলনায় কোম্পানিটির চাহিদা নগণ্য। গ্যাস সংযোগ প্রদানের ক্ষেত্রে কারিগরি এবং আর্থিক সশ্লিষ্টতা নেই। সংযোগ প্রদান করা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
এত সুপারিশ থাকার পরও দৃশ্যমান গ্রহণযোগ্য কোনো কারণ ছাড়াই জারিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের আবেদন বাতিল করে দিয়েছে মন্ত্রণালয় কমিটি। সিনিয়র সহকারী সচিব স ম আজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগের নীতিগত অনুমোদন প্রদান করা সম্ভব নয় মর্মে নির্দেশক্রমে অবহিত করা হলো।’ মাত্র এক বাক্যের এ চিঠিতে পুরো কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
মেসার্স জারিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. জাবেদ কালবেলাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সংযোগ না দেওয়ার কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সংযোগের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, বিএসটিআইর সনদসহ সব প্রক্রিয়া শেষ করেছি। এখন জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করে উৎপাদন করছি। গ্যাস পেলে উৎপাদনের পরিমাণ অনেক বাড়ত।’
অবশ্য শুধু জারিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডই নয়, আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানি তাদের কারখানা প্রস্তুত হওয়ার পরও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, কমিটির লোকজনকে খুশি করতে না পারলে সংযোগের আবেদন বাতিল হয়ে যায়। আবার কোনোরকম যৌক্তিকতা ছাড়াই অনেকেই সংযোগের অনুমোদন পেয়েছেন।
চট্টগ্রামের কনফিডেন্স সল্ট লিমিটেডের প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি শেষ, কারখানাটির গ্যাস সংযোগও এর আগে অনুমোদিত। কোম্পানিটি নিরাপত্তা জামানতও জমা দিয়েছে। সেই কোম্পানির গ্যাস সংযোগ এখনো দেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর পাঠানো তালিকা অনুসরণ না করে বেছে বেছে অনুমোদনের সুপারিশ করে জ্বালানি বিভাগ। এমনকি বিতরণ কোম্পানির তালিকায় নেই, আবার মন্ত্রণালয় কমিটিও সুপারিশ করেনি—এমন কোম্পানিকেও সংযোগ প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা সল্ট অ্যান্ড কেমিক্যালস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানির গ্যাস সংযোগের চিঠি নিয়ে এমনই অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি মন্ত্রণালয় কমিটির বাছাইয়ের তালিকাভুক্ত নয়, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক জোন কিংবা রপ্তানিমুখী না হলেও ঘণ্টাপ্রতি ২ লাখ ৭৬ হাজার ঘনফুট গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় কমিটির সদস্য পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন ও বিপণন) মো. ইমাম উদ্দিন শেখ স্বাক্ষরিত চিঠিতে তিতাস গ্যাস কোম্পানির বোর্ডে অনুমোদন দিতে বলা হয়েছে।
সংযোগের পাশাপাশি লোড বৃদ্ধি, লাইন পরিবর্তন, পুনর্বিন্যাসের যাবতীয় কাজের জন্যও এখন মন্ত্রণালয়ে দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। আইন অনুযায়ী বোর্ডগুলোকে এখতিয়ার দেওয়া থাকলেও পরিপত্রের মাধ্যমে বোর্ডকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয় কমিটির গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া তারা হাত দিতে পারছে না।
যমুনা গ্রুপের পরিচালক সামশুল আলম বিইআরসির গণশুনানিতে অভিযোগ করে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় কমিটির কবে সময় হবে, কবে ফিল্ড ভিজিট করবে, তার জন্য ধরনা দিতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে আমার ১ হাজার ঘনফুট গ্যাসের অনুমোদন রয়েছে, মেশিন আনার পর দেখা যাচ্ছে আরও বাড়তি ৪ ঘনফুট গ্যাস দরকার। এর জন্য মাসের পার মাস ঘুরতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ আগে এ কাজটি বোর্ড অনুমোদন দিত।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে অতিরিক্ত সচিব (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) রফিকুল আলম এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয়গুলো আমি এখন দেখছি না। তবে জারিয়ান ফুডের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন পজিটিভ (ইতিবাচক) কোনো রিপোর্ট দেয়নি। শিল্পাঞ্চলের বাইরে ছিল কারখানাটি।’
আর পাশের সচল কারখানার আবেদন বাতিল করে মাটি ভরাট করেই নির্মিতব্য কারখানা গ্যাসের সংযোগ কীভাবে পেল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অন্ধকারে আছি।’
মন্তব্য করুন