

ইরানে হামলার চিন্তা এখনো বাদ দেননি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তার সহযোগীদের তেহরানে হামলার পরিকল্পনার জন্য বলছেন। যেটিকে চূড়ান্ত হামলা হিসেবে অভিহিত করছেন তিনি। গতকাল বুধবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, ট্রাম্প ইরানে হামলার প্রস্তুতি বাদ দিতে বললেও এখন আবার নতুন পরিকল্পনা দিতে বলছেন। এদিকে তেহরান হুমকি দিয়েছে যে ইরান এবার আক্রান্ত হলে সর্বস্ব দিয়ে পাল্টা হামলা চালানো হবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, ইরানে হামলার ব্যাপারে আলোচনার সময় এটিকে ট্রাম্প কয়েকবার চূড়ান্ত হামলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার নির্দেশনার পর হোয়াইট হাউস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিভিন্ন ‘অপশন’ দিয়েছেন। যার মধ্যে ইরানের সরকার পতনের পরিকল্পনাও আছে। এ ছাড়া অন্যান্য অপশনের মধ্যে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের অবকাঠামো সীমিত হামলার বিষয়টিও আছে।
ট্রাম্প হামলার পরিকল্পনা বাদ দেননি জানিয়ে ওই কর্মকর্তারা বলেছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এমন সময় এ তথ্য জানালো যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধবিমান। এসব যুদ্ধবিমান ও রণতরী ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের জন্য ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মোতায়েন করেছিলেন ট্রাম্প।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি নতুন করে হুমকি দিয়েছেন, এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালায় তাহলে তারা কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা রাখবেন না। হামলার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা হামলা শুরু হবে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নতুন গুঞ্জন ও মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির রণতরী এবং যুদ্ধবিমান আসার খবরের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরান আক্রান্ত হলে সর্বস্ব দিয়ে পাল্টা হামলা চালানো হবে।
এদিন ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে এক মতামত কলামে তিনি লিখেছেন, ‘২০২৫ সালের জুনে ইরান যে সংযম দেখিয়েছিল, এবার সেরকম হবে না। যদি আমরা নতুন হামলার শিকার হই তাহলে আমাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী সর্বস্ব দিয়ে পাল্টা হামলা চালাবে। তাদের মধ্যে কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না।’
গত বছরের জুনে দখলদার ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এরপর তাদের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়, যা ১২ দিন স্থায়ী হয়। এ যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটির বিমানবাহিনী ওই সময় ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বাঙ্কার ব্লাস্টার বোমা হামলা চালায়।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার মতামত কলামে আরও লিখেছেন, ‘এটি কোনো হুমকি নয়, বাস্তবতা। আমার মনে হয় এটি ভালোভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ একজন কূটনীতিক এবং সাবেক সেনা হওয়ায় আমি যুদ্ধকে ঘৃণা করি।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ অবশ্যই তীব্র এবং দীর্ঘ হবে, ইসরায়েল এবং তার প্রক্সিরা যতটা দীর্ঘ হওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রকে বলছে তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি দীর্ঘ হবে। এই যুদ্ধ অবশ্যই পুরো অঞ্চলকে গ্রাস করবে এবং বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়বে।’
এর একদিন আগে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে নিজের কিছু হলে ইরানকে ‘পৃথিবী থেকে মুছে ফেলার’ নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন।
এর আগে ইরান হুমকি দেয়—যদি তাদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করা হয় তাহলে ট্রাম্পের শুধু হাতই বিচ্ছিন্ন করা হবে না তাকে হত্যাও করা হবে। এর জবাবে পাল্টা এ হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানের সেনাবাহিনীর জেনারেল আব্দুলফজল শেখারচি বলেন, ‘ট্রাম্প জানেন যদি আমাদের নেতাদের দিকে আগ্রাসনের কোনো হাত বাড়ানো হয়, তাহলে আমরা শুধু ওই হাতটিই বিচ্ছিন্ন করব না। আর এটি শুধু কোনো স্লোগান নয়, বাস্তব কথা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পুরো বিশ্বে আগুন জ্বালিয়ে দেব এবং তাদের জন্য কোনো নিরাপদ স্থান রাখব না।’
ইরানি জেনারেলের হুমকির জেরে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমার খুবই কঠোর নির্দেশনা দেওয়া আছে, (যদি) কিছু হয়। তারা (মার্কিন সেনা) ইরানকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলবে।’
গত বছরও ট্রাম্প একই ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যদি ইরান আমাকে হত্যা করে তাহলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ২০২০ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের চৌকস ইউনিট কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর ট্রাম্পকে ওই সময় হত্যার হুমকি দেয় ইরান।
এবার নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটেছে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। ওই দিন তেহরানের বাজারে বিক্ষোভে নামেন ব্যবসায়ীরা। ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ওই আন্দোলন শুরু হয়। পরে অবশ্য প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয় এবং সারাদেশে ছড়ায়। এ বিক্ষোভ দমনে কঠোরতা দেখায় প্রশাসন। এর মধ্যে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়।
এ আন্দোলনের শুরু থেকেই প্রকাশ্যে এতে সমর্থন দেয় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প শুরুর দিকে হুমকি দেন—বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে পদক্ষেপ নেবে ওয়াশিংটন। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে হুমকি দিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
মন্তব্য করুন