রোগ বা দুর্ঘটনার কারণে অনেককে দীর্ঘসময় বিছানায় থাকতে হয়। অনেকে আছেন যাদের হুইলচেয়ারে কাটাতে হয় অনেকটা সময়। এসব ক্ষেত্রে রোগীর ত্বকে বেড সোর দেখা দিতে পারে। সময়মতো যার চিকিৎসা না করালে উটকো ঝামেলা হয়ে দেখা দিতে পারে এটি।
বেড সোরের আরেক নাম প্রেশার আলসার। ত্বকের সঙ্গে কোনো বস্তুর দীর্ঘসময় চাপ লাগলে এটি দেখা দেয়। মূলত রোগীকে টানা কয়েক সপ্তাহ বা মাস শুয়ে থাকতে হলে এ সমস্যা বেশি দেখা দেয়।
শুয়ে থাকার কারণ ত্বকের বিভিন্ন অংশের চামড়ার নিচে চাপ লেগে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে এমনটা হয়। শরীরের যেসব স্থানে সহজেই হাড়ে চাপ লাগে সেসব স্থানে বেড সোর বেশি হয়। যেমন—পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, নিতম্ব ও টেইলবোন।
লক্ষণ
** ত্বকে ছোপ ছোপ দাগ বা নতুন ধরনের কোনো বিন্যাস দেখা দেওয়া।
** ত্বকের কিছু অংশে ফোলাভাব ও সেখান থেকে পুঁজ বের হওয়া।
** ত্বকের চাপ লেগে থাকা কোনো অংশে যদি স্বাভাবিকের চেয়ে কম বা বেশি তাপ অনুভূত হয়।
যেসব স্থানে প্রেশার আলসার হতে পারে
** মেরুদণ্ডের নিচের দিকে থাকা টেইলবোন ও নিতম্বে।
** কাঁধের নিচের অংশ (শোল্ডার ব্লেড) ও মেরুদণ্ডে।
** হাত ও পায়ের যে অংশ দীর্ঘসময় চেয়ারের সঙ্গে লেগে থাকে।
** বিছানায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে মাথার পেছনের দিক ও ঘাড়।
** নিতম্ব ও লোয়ার ব্যাক।
** গোড়ালি বা হাঁটুর পেছনের চামড়া।
কেন হয়
একনাগাড়ে ত্বকের কোথাও চাপ লাগলে সেখানে রক্ত সঞ্চালন কমে যায় ও অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। এতে সেই সব স্থানে পুষ্টিও পৌঁছায় না। এতে দীর্ঘমেয়াদে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা যায়।
ত্বকের সঙ্গে বিছানার চাদর বা তোশকের ক্রমাগত ঘর্ষণে অনেক সময় দুর্বল ত্বকের উপরিভাগ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ত্বকের যে অংশগুলো সচরাচর আর্দ্র থাকে সেখানে এ সমস্যা বেশি হয়।
আবার অনেক সময় রোগীর নড়াচড়ার কারণে পিঠের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে যায়। এই ভাঁজ দীর্ঘক্ষণ থাকলেও বেড সোর দেখা দিতে পারে।
ঝুঁকিতে কারা
** দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে বা অস্ত্রোপচারের পর যাদের দীর্ঘসময় শুয়ে বা বসে কাটাতে হয়।
** মল-মূত্র বিছানায় ত্যাগ করে থাকলে সেগুলো ত্বকের সংস্পর্শে যত বেশি সময় থাকবে তত বেড সোরের আশঙ্কা বাড়বে।
** ডায়াবেটিস বা নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডারের কারণে অনেকে তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অনুভূতি হারিয়ে ফেলে। এমন রোগীরাও তাদের ত্বকের কোনো চাপ বা ক্ষত সহজে টের পায় না।
** শুয়ে বসে থাকা ছাড়াও বেড সোর হতে পারে পুষ্টিহীনতা থেকে। পুষ্টির অভাব বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা কারণেও ত্বকের টিস্যু ভেঙে এই আলসার সৃষ্টি করতে পারে।
জটিলতা
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করা হলে বেড সোর বেশ গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। প্রথমেই দেখা দিতে পারে ত্বকের নরম টিস্যু সংক্রমণ তথা সেলুলাইটিস। এতে কারও ব্যথা অনুভূত হয় আবার নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত থাকলে রোগী সেটিও টের পায় না।
বেড সোর থাকলে হাড় ও জয়েন্টের ইনফেকশন দেখা দিতে পারে।
আরও বেশি দিন চিকিৎসা ছাড়া থাকলে ক্ষতস্থানে তৈরি হতে পারে কারসিনোমা কোষ, যা এক ধরনের ক্যান্সার।
প্রতিরোধ
যাদের শুয়ে বসে থাকতে হচ্ছে তাদের প্রতি ঘণ্টায় পজিশন বদলে দিতে হবে। সম্ভব হলে বিশেষ বেড সোর প্রতিরোধক ম্যাট্রেস ব্যবহার করতে হবে। এই তোশকে শরীরের ওজন সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
বেড সোরের সমস্যা এড়াতে বিশেষ বিছানা আছে। তাতে রোগীকে রেখে সর্বোচ্চ ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকা করে শোয়ানো যায়।
যাদের হুইল চেয়ারে বসে থাকতে হয় তাদের সম্ভব হলে দুই হাতে ভর দিয়ে শরীরকে মাঝে মাঝে যতটা সম্ভব উঁচু করতে হবে।
রোগীর ত্বক কোনোভাবেই ভেজা রাখা যাবে না। বিছানা আর্দ্র মনে হলে তা বদলে দিতে হবে। ঝুঁকি এড়াতে রোগীর ত্বক দিনে কয়েকবার পরীক্ষা করতে হবে।
তথ্যসূত্র : মায়োক্লিনিক
মন্তব্য করুন