

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছিল চট্টগ্রামে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই চট্টগ্রাম থেকেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন জেড ফোর্সের। আবার এই চট্টগ্রামেই কেটেছে তার জীবনের শেষ রাত, এখানেই ঘাতকের বুলেটে নির্মমভাবে প্রাণ হারান তিনি। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ারও অসংখ্য স্মৃতি রয়েছে এ চট্টগ্রামে। বন্দরনগরী খ্যাত এ অঞ্চল বাণিজ্যিক রাজধানীর পথে যাত্রা শুরু করে বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরেই। এবার চট্টগ্রামের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়তে আসছেন তাদেরই সন্তান, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমান—মুক্তিযুদ্ধ থেকে জীবনের শেষ দিন: ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এই ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। এ ঘোষণার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা লাভ করে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি চট্টগ্রামে অবস্থানরত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সেনাদের নেতৃত্ব দেন এবং চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের একটি বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরবর্তীতে তিনি ১নং সেক্টর এবং জেড-ফোর্সের প্রধান হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম সফর করেন। সে সময় তিনি চট্টগ্রামের গ্রামীন উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হারলা গ্রামে বরুমতি খাল খননের মধ্য দিয়ে তিনি সেই কার্যক্রমের সূচনা করেন। খাল খননের সময় তিনি একটি বৈঠকখানায় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। গত বছরের শেষদিকে সেই স্মৃতিফলক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
এর পরের বছর আবার চট্টগ্রাম সফর করেন তিনি। আর এটাই ছিল তার শেষ সফর। নিজ দলের নেতাদের অন্তর্কোন্দল মেটাতে চট্টগ্রাম আসেন তিনি। দিনটি ছিল ১৯৮১ সালের ৩০ মে। সার্কিট হাউসে বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এরপর তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় রাঙ্গুনিয়ায় এক পাহাড়ে। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে সেটি জিয়ানগর হিসেবে পরিচিত।
একই বছরেরই ৩ জুন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসকে জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে সার্কিট হাউসকে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়। ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করেন।
খালেদা জিয়ার হাত ধরেই চট্টগ্রামের উন্নয়ন: চট্টগ্রামকে সব সময় বলা হয়, বিএনপির ঘাঁটি। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে নির্বাচিত ৮ এমপিকেই তিনি মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছিলেন। এটা চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির।
বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের আমলে চট্টগ্রামে যেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হয়েছে, সেগুলো এখনো মানুষের আলোচনায়। ১৯৯৫ সালের ২৮ নভেম্বর বেগম জিয়া চট্টগ্রামে আসেন এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি’। বন্দরনগরী খ্যাত চট্টগ্রামকে তিনি বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করেন। ২০০৩ সালের ৬ জানুয়ারি সে প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করে। বাণিজ্যিক রাজধানী বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নগরীর আগ্রাবাদে চট্টগ্রাম চেম্বারকে ‘বাণিজ্য নগরের প্রতীক’ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার বা বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়া এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
তবে চট্টগ্রামে বেগম জিয়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে দেখা হয় তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুকে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে তৃতীয় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় তার সরকারের সময়।
তিনি চট্টগ্রামের দুটি আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-৮ (বর্তমানে চট্টগ্রাম-১১) আসন থেকে এবং ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১ মিরসরাই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
নতুন বার্তা নিয়ে চট্টগ্রামে তারেক রহমান: প্রায় একুশ বছর আগে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ২০০৫ সালের সেই নির্বাচনে বিএনপির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সাবেক মেয়র ও নগর বিএনপির সভাপতি মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন। তার পক্ষ হয়ে প্রচারে এসেছিলেন তৎকালীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান।
এরপর ২১ বছর পার হয়ে গেছে। আজ আবার চট্টগ্রামে মহাসমাবেশে অংশ নিতে পলোগ্রাউন্ডে আসছেন তারেক রহমান। তার আগমন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে—এমনটাই মনে করেন চট্টগ্রামবাসী।
মন্তব্য করুন