একটা সময় ঢাকাই সিনেমার সুনাম ছিল দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জনপ্রিয়তা ছিল বিশালতায় পরিপূর্ণ। নতুন সিনেমার অপেক্ষায় থাকতেন দর্শক। রুপালি পর্দায় শুক্রবার মানেই ছিল যেন ঈদ উৎসবের আমেজ। প্রেক্ষাগৃহগুলো দর্শকের ভিড়ে গমগম করত সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। ছিল না আধুনিক প্রচার ব্যবস্থা। গণমাধ্যমেও সেভাবে আসত না মুক্তির তালিকায় থাকা সিনেমাগুলোর শিরোনাম। এলাকাজুড়ে মাইকিং ও রঙিন পোস্টারই ছিল তখনকার সিনেমার বিজ্ঞাপন। এতটুকুতেই হল মালিকরা ঘরে নিতেন লাভের অর্থ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে দেশের সিনেমাহলগুলো এখন পরিণত হয়েছে ব্যবসার গুদাম, কমিউনিটি সেন্টার ও ভাড়া দোকানে। আবার অনেক হল তো বন্ধ হয়ে শুধু দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।
বিশ্ব এখন আধুনিক হয়েছে। সিনেমা মুক্তির অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম এসেছে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে। ঘরে বসেই এখন দেখা যাচ্ছে বিশ্বের বাঘা বাঘা নির্মাতা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীর সিনেমা। তবে সেইসঙ্গে আধুনিক হয়েছে বিশ্বের রুপালি পর্দাগুলো। এসব সিঙ্গেল স্ক্রিন থেকে হলিউড, বলিউডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইন্ডাস্ট্রি পকেটে পুরছে লাখ লাখ ডলার। আয়ের দিক থেকে গড়ছে একের পর এক ইতিহাস। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ধুঁকছে তো ধুঁকছেই। বছরজুড়ে নির্মাতারা সিঙ্গেল স্ক্রিনে ব্যর্থ হচ্ছেন মানসম্মত নতুন সিনেমা মুক্তিতে, যার ফলে বছরের অনেকটা সময় বন্ধ থাকছে ধুঁকতে থাকা হলগুলো। শুধু দুই ঈদকে কেন্দ্র করেই মুক্তি পাচ্ছে বিগ বাজেটের বড় তারকাদের সিনেমা। এ দুটি উৎসব কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন জেলার সিনেমাহলগুলোতে নতুন করে আলো জ্বলে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হল বাঁচাতে দুটি উৎসবই কি যথেষ্ট?
এই প্রশ্ন নিয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা হয় মধুমিতা সিনেমা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ ও প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলের সঙ্গে।
শুরুতেই নওশাদ বলেন, ‘আমরা সবাই জানি মাত্র দুটি ঈদ দিয়ে সিনেমা হল বাঁচানো সম্ভব নয়। বছরে ৫২ সপ্তাহ। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ সিনেমা চালিয়ে বাকি ৪০ সপ্তাহ হল চালিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য আমাদের সিনেমা দরকার। নতুন নতুন কনটেন্ট দরকার, যা আমরা পাচ্ছি না অনেক বছর ধরে। প্রতি ঈদে হলে দর্শক কিন্তু ফিরছে। এর কারণ কিন্তু সিনেমা। আমাদের চেহারা দেখার জন্য তারা কিন্তু হলে আসেন না। তাহলে আপনারা আমাদের সিনেমা দিন। সেটি দেশি হোক কিংবা বিদেশি। আমাদের এনে দিন। তা না হলে এই ব্যবসা করা সম্ভব নয়। এখন তো অনেক নামকরা হলই বন্ধ হয়ে গেছে। যে কয়টি টিকে আছে সিনেমা না থাকলে সেগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আপনারা সিনেমা চালাবেন কোথায়।’ এ সময় নওশাদ তার সিনেমা হলের যে ক্ষতি হয়েছে সে বিষয় নিয়েও কথা বলেন। জানান, দর্শক এসেছে সিনেমা দেখতে এটাই আমার জন্য আনন্দের। এ ছাড়া মাধুমিতায় লাগানো হচ্ছে নতুন সাউন্ড সিস্টেম, যা দর্শকদের আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে উজ্জ্বল বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়—মাত্র কয়েক সপ্তাহের দর্শক দিয়ে গোটা বছর হল চালানো। একটা হলে অনেক রকমের খরচ রয়েছে। কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুৎ বিল, পরিচালনা বিলসহ নানা ধরনের খরচ রয়েছে। যে টাকা প্রতি মাসেই হল মালিকদের খরচ হয়। কিন্তু প্রতি মাসে তো আর আমরা নতুন সিনেমা পাই না। দুই ঈদে সিনেমা মুক্তির পর এখন কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, নতুন কোনো সিনেমা নেই হলে। এভাবে চলে না। আমরা কিন্তু দেখিয়ে দিয়েছি। হলে দর্শক আসে যদি আমাদের ভালো সিনেমা দেওয়া হয়। কিন্তু দুই ঈদের পর ছয় মাসেও নতুন কোনো ভালো সিনেমার খবর থাকে না। তাহলে আমরা চলব কীভাবে। আমরা বরাবরই বলে আসছি, হল বাঁচলেই সিনেমা বাঁচবে। সেক্ষেত্রে আমাদের বাঁচাতে কী করণীয় তা নিয়ে এরই মধ্যে আমরা শিল্পী সমিতি, প্রযোজক সমিতি ও পরিচালক সমিতিসহ অন্যান্য সমিতির সঙ্গে কথা বলছি। আশা করছি এর একটি ভালো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে।’
এ সময় হল বাঁচাতে নতুন ও ভালো বাংলা সিনেমা নির্মাণের কথা বলেন উজ্জ্বল। তিনি আরও বলেন, ‘হল বাঁচাতে আমাদের প্রতি সপ্তাহেই নতুন একটি দুটি সিনেমা প্রয়োজন। তবে সিনেমা শুধু নতুন হলেই হবে না, দর্শক কী চায়, কাদের চায়, সে বিষয়েও অবগত থাকতে হবে। তাহলে সারা বাংলাদেশের হলগুলোতে সারা বছর দর্শকদের জোয়ার থাকবে বলে আমি আশাবাদী। তা না হলে ছয় মাসে একটি সিনেমা মুক্তি দিয়ে আমাদের বাঁচানো যাবে না।’
কয়েক বছর ধরেই দুটি ঈদ ছাড়া দেশের প্রেক্ষাগৃহে নতুন তেমন কোনো সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে না। এ ছাড়া বছরজুড়ে যেসব সিনেমা মুক্তি দেওয়া হচ্ছে সেগুলোও দর্শক টানতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে এই দুই হল মালিক নেতা মনে করছেন দর্শক যা চাইছে তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে সিনেমা সংশ্লিষ্টরা। তাই এখনই যদি নতুন সিনেমা নির্মাণে মনোযোগী না হওয়া হয়, তাহলে শিগগিরই ধুঁকতে থাকা হলগুলো একটা সময় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে হল মালিকরা।