

চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। বিশেষ অভিযানে এ ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রের ৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এটি ছিল দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে বিব্রত করার গভীর ষড়যন্ত্র।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ এসব তথ্য জানায়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, গত ডিসেম্বরে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় একাধিক বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে কয়েকটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি উসকানিমূলক ব্যানার উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যানারগুলোতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতাদের নাম ও অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল।
পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়, রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে অগ্নিসংযোগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক।
ঘটনার তদন্তে তথ্য-উপাত্ত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কলেজ গেট এলাকা থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও ছয়জনকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ৪টি উসকানিমূলক ব্যানার, ২টি কেরোসিন তেলের কনটেইনার, ১টি কেরোসিন তেলের বোতল, ৩টি কেরোসিনে ভেজানো লুঙ্গি ও শার্ট ও ৩টি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন’ ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলাই ছিল তাদের লক্ষ্য।
এ ঘটনায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক সাবেক কমিশনারের আর্থিক মদদের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন, মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ।
গ্রেপ্তার মনির হোসেন ইতোমধ্যে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। এই অগ্নিসংযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যারা সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আগুন দিয়ে যারা সম্প্রীতি পোড়াতে চায়, তাদের আগুনেই পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। অপরাধী যেই হোক, যত প্রভাবশালীই হোক— আইনের বাইরে কেউ নয়।
পুলিশ জানায়, আটকদের তথ্যের ভিত্তিতে অন্যান্য পলাতক সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অগ্নিসংযোগ, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া পুলিশ সুপার (অপরাধ) সিরাজুল ইসলাম পিপিএম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) রাসেল, রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি বেলায়েত হোসেন, রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন