

হাইকোর্টের একটি রায়কে কেন্দ্র করে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেগুলোতে দাবি করা হয়, আদালত বলেছেন, ‘দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’। শিরোনাম ও প্রতিবেদনে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে যেন আদালত দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বাধ্যবাধকতা পরিবর্তন কিংবা শিথিল করেছে।
এরকম সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
এসব প্রতিবেদনের ইন্ট্রোতে স্পষ্টতই দাবি করা হয়েছে, বহু বিবাহ সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং এতদিন আগের স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যেত না। কিন্তু নতুন রায় অনুযায়ী সেটি করা যাবে।
তবে দ্য ডিসেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ‘দ্বিতীয় বিয়েতে স্ত্রীর অনুমতি লাগবে না’— এই বক্তব্যটি অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। হাইকোর্ট পূর্বেকার আইনে কোনো পরিবর্তন আনেনি বা বহু বিয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি কাঠামো শিথিলও করেনি। বরং আদালত মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর বহুবিবাহ সংক্রান্ত পূর্বেকার বিধান বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি রিট আবেদন করেন। আদালত রিট আবেদনটি খারিজ করে পূর্বের বিধান অবিকল বহাল রেখেছে।
সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এই বিষয়টি স্পষ্ট না করে উল্টো বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করা হয়েছে।
আইনে কী আছে
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না এবং এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশকরণ) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।
(২) ১ উপধারায় বলা হয়েছে, অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফিসসহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করতে হবে ও তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণগুলো এবং এই বিবাহের বিষয়ে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ থাকবে।
(৩) ২ উপধারায় বলা হয়, দরখাস্ত গ্রহণ করার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। ওইরূপ গঠিত সালিস কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলে মনে করলে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে—এমন সব শর্ত থাকলে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।
(৪) উপধারায় বলা হয়, দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য সালিসি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনা চেয়ে দরখাস্ত দাখিল করতে পারে; তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে ও কোনো আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
৬ (৫) উপধারায় বলা হয়েছে যদি কোনো ব্যক্তি সালিসি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে তা আইনের । ৫ (ক) অনুসারে, বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। এই টাকা ওইরূপ পরিশোধ না করা হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং ৫ (খ) অনুসারে, অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা (দশ হাজার টাকা পর্যন্ত) বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
রায়ের প্রেক্ষাপট
এই রায়টি এসেছে মূলত বহুবিবাহ সংক্রান্ত একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে, যেখানে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তা বাতিল এবং বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করার জন্য নতুন নীতিমালার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে ওই রিটটি হাইকোর্টে দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান।
রিটে তার বক্তব্য ছিল, সংশ্লিষ্ট আইনের ৬ ধারার মাধ্যমে কার্যত বহুবিবাহকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে; কারণ এই ধারার অধীনে গঠিত সালিশি (আরবিট্রেশন) পরিষদ প্রধানত পুরুষ সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সেখানে আগের স্ত্রী বা স্ত্রীদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার নিশ্চিত না করেই ঢালাওভাবে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়, যা শেষ পর্যন্ত নারীর মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করে।
শুনানি শেষে ‘ইশরাত হাসান বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি সৈয়দ জাহেদ মনসুরের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ২০ আগস্ট রায় দেন। হাইকোর্ট রুল খারিজ করে দিয়ে ২৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেন, ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারার অধীনে বহুবিবাহের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া বৈষম্যমূলক বা স্বেচ্ছাচারী নয় এবং এটি নারী বা পুরুষ—কারও মৌলিক অধিকার হরণ করে না।’
রায়ে আরও বলা হয়, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীর একক অনুমতি নয়, বরং আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির ভিত্তিতেই বিষয়টি নিষ্পন্ন হবে, কারণ আইনে স্ত্রীর ব্যক্তিগত অনুমতিকে একমাত্র শর্ত হিসেবে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, এটি নতুন কোনো বিধান নয়; বরং বিদ্যমান আইনই বহাল রয়েছে।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী সৈকত জামানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণের কাঠামো শুরু হয় ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায়, যেখানে অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক আইন চালুর পর পুরুষের ক্ষেত্রে এই শাস্তির ধরন পরিবর্তন হয় এবং দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
আইনজীবী সৈকত জামান বলেছেন, এই রায়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন হাইকোর্ট নতুন কোনো সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অথচ দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধান দীর্ঘদিনের চলমান প্রক্রিয়া। তিনি মনে করেন, সম্পূর্ণ রায় না পড়ে বা বিচারপতির কোনো একটি পর্যবেক্ষণ আলাদা করে তুলে ধরে শিরোনাম করার ফলে জনজীবনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে, যা আদালতের রায়ের প্রকৃত প্রভাব বিকৃত করে।
সূত্র : দ্য ডিসেন্ট
মন্তব্য করুন