ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৩, ০৯:১১ এএম
অনলাইন সংস্করণ

কুমিল্লায় অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে সাহেব বাড়ি

কৃমিল্লায় অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সাহেব বাড়ি। ছবি : কালবেলা
কৃমিল্লায় অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে সাহেব বাড়ি। ছবি : কালবেলা

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় অযত্নে নষ্ট হচ্ছে ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত মোগল আদলে তৈরি প্রাচীন স্থাপত্য সাহেব বাড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। অযত্নে-অবহেলায় কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে বাড়িটি। নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ধরে রাখতে বাড়িটির সংরক্ষণের দাবি এলাকাবাসীর।

স্থানীয়দের থেকে জানা যায়, কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর বাসস্ট্যান্ড হতে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বদিকে মাধবপুর গ্রামে এটি অবস্থিত। প্রাচীন এই বাড়িটির নাম সাহেব বাড়ি নামেই পরিচিত। ১৯২৫ খ্রিস্টব্দে সম্ভ্রান্ত পরিবারের দুই ভাই মো. আলতাফুর রহমান মিয়া (রঙ্গু মিয়া) ও মো. হাবিবুর রহমান মিয়া (ছন্দু মিয়া ) বিভিন্ন নান্দনিক নকশাখচিত দৃষ্টিনন্দন ওই বাড়িটি নির্মাণ করেন। মো. হাবিবুর রহমান (ছন্দু মিয়া) ছিলেন তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার। তাদের বাবার নাম ছিল মো. জারু মিয়া। ওই বাড়িটিতে বর্তমানে কেউ বসবাস করেন না। বাড়িটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। বাড়িটির পূর্বপাশে দুটো শানবাঁধানো ঘাটসহ একটি বড় পুকুর আছে। এর মধ্যে একটি ঘাট সংরক্ষিত ছিল নারীদের জন্য।

জানা যায়, তাদের পূর্বপুরুষ হুক্কা লাল বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ থেকে ত্রিপুরা বর্তমান কুমিল্লায় এসে বসতি স্থাপন করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষে যেসব দেশপ্রেমিক বীর সেনানীরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জীবন দান করে গেছেন তাদেরই একজন ছিলেন হুক্কা লালের পিতা মোহন লাল। পলাশীর যুদ্ধের পর মীরজাফর ছেলে মিরনের অত্যাচার থেকে বাঁচার লক্ষ্যে রাতের আঁধারে নৌকাযোগে দীর্ঘপথ পারি দিয়ে পূর্ববঙ্গের ত্রিপুরা বর্তমানে কুমিল্লা জেলার কালিদাহ সায়য়ের পূর্বপাড়ে সপরিবারে চলে আসেন হুক্কা লাল। এই স্থানে আগে কোনো জনবসতি ছিল না, তাই হুক্কা লাল তার বাবা মাধব লালের নাম অনুসারে এই স্থানটির নামকরণ করেন মাধবপুর। তারপর থেকে পরিবারসহ তিনি এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। পরে ইয়েমেন থেকে আগত ইসলাম ধর্ম প্রচারক শেখ মহিউদ্দিন মৌলভী পার্শ্ববর্তী মিরপুর গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরে মহিউদ্দিন মৌলভীর সঙ্গে হুক্কা লাল আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে সনাতন ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং নিজের নাম বদলে রাখেন শেখ লাল। তারপর থেকে একজন সম্ভ্রান্ত মুসলিম হিসেবে সপরিবারে তিনি এখানেই বসবাস করে গেছেন। এই সাহেব বাড়ি তারই বংশধরের নির্মিত তৎকালীন আলিশান প্রাসাদ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মোগল স্থাপত্যের আদলে তৈরি ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে টিকে থাকা ওই পরিত্যক্ত সাহেব বাড়িজুড়ে এখন শুধুই অযত্ন আর অবহেলার ছাপ। বাড়িটির দেয়ালের পলেস্তারা ধসে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে ইট। দেয়ালে ও মেঝেতে পড়েছে শ্যাওলার আস্তরণ। অযত্নে ছাদ থেকে খসে পড়ছে আস্তরণ। দেয়ালে ও ছাদের উপরিভাগে জন্মেছে পরজীবী বৃক্ষ। মরিচা ধরেছে পারিবারিক ব্যবহৃত লোহার জিনিসপত্রে। বিভিন্ন কক্ষে অগোছালো পড়ে আছে তৎসময়ের ব্যবহারিক নিদর্শন। পরিচর্যার অভাবে শেওলা ও আগাছা গজিয়ে বাড়িটির পাশের পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটের সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সুলতান আহাম্মদ বলেন, সাহেব বাড়িটি দেখতে মাঝে মাঝে লোকজন আসেন। বাড়িটি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষিত নেই বলে অবহেলায় অযত্নে বিলীন হতে চলেছে সাহেব বাড়ির ঐতিহ্য। বাড়িটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এ বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুলতানি আমলের পলাশীর যুদ্ধের ইতিহাস।

মাধবপুর ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন বলেন, মূলত ১৯ শতকে নবজাগরণের সময় বাংলার সংস্কৃতির বিকাশ লাভ করে। সেই সংস্কৃতির ছোঁয়া রয়েছে এ দেশে তৈরি নানান স্থাপত্যকর্মে, যা ইতিহাস হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের সোনালি অতীত তুলে ধরছে। শুধু আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছেই নয়, প্রতি বছর বাইরের দেশ থেকে আসা হাজারো পর্যটকের কাছেও দেশটি সুনাম কুড়াচ্ছে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু স্থাপত্য এবং সেগুলোর অসাধারণ নির্মাণশৈলীর জন্য। কালের সাক্ষী হয়ে থাকা এসব নিদর্শন বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের পরিচিতি ও সুনাম অর্জনে অনেকটাই ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তার বিপরীতে সঠিক তদারকি আর তত্ত্বাবধানের অভাবে এসব ঐতিহাসিক স্থাপত্য হারাতে বসেছে তার পুরোনো জৌলুশ। মাধবপুর এলাকার প্রাচীন স্থাপত্য ওই সাহেব বাড়িটি অসংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এ ধরনের স্থাপত্যের দেখভাল করা বাঙালি হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব বলে আমি মনে করি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পদ্মায় ঝাঁপ দেওয়া সেই নারীকে জীবিত উদ্ধার

রাজনীতি নিষিদ্ধ যবিপ্রবিতে ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটি, সদস্যদের কারও নেই ছাত্রত্ব

তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান 

প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরেক ফুটবলারের অভিষেক

সিরিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৩৫

রাজবাড়ীতে সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ

শাহজালাল বিমানবন্দর এলাকায় আগুন, এক ঘণ্টায় নিয়ন্ত্রণে

বিলাসবহুল গাড়িতে পাওয়া গেল কোটি টাকার গাঁজা

ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ভারতের প্রাচীন বৌদ্ধ স্থান সারনাথ

পরিচয় মিলল চলন্ত ফেরি থেকে পদ্মায় ঝাঁপ দেওয়া নিখোঁজ সেই নারীর 

১০

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র, সম্পাদক শুভাশীষ কুমার

১১

রাওয়ার উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

১২

রিয়ালে এক পা বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলজয়ী তারকার!

১৩

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপি নেতা গুলিবিদ্ধ 

১৪

ফ্যামিলি কার্ড নিয়োগ পরীক্ষায় ছাত্রদলের ২ নেতার মারামারি

১৫

মেসি আর্জেন্টিনার নন! রক্তে ব্রাজিলের ছোঁয়া, গবেষণায় বেরিয়ে এলো পারিবারিক ইতিহাসের এক অজানা অধ্যায়

১৬

গোপনে কারামুক্ত হলেন তৌহিদ আফ্রিদি

১৭

মৌলভীবাজারে দায়ের কোপে নারীর পা বিচ্ছিন্ন

১৮

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি থেকে পদ্মায় ঝাঁপ, নারী নিখোঁজ

১৯

ঈশানের প্রত্যাবর্তন আর তিলকের তাণ্ডবে নতুন রেকর্ড ভারতের

২০
X