নূর হোসেন মামুন, চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪৪ এএম
অনলাইন সংস্করণ

ত্রিপুরা ভাষায় পাঠদান না থাকায় চট্টগ্রামে ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থী

ত্রিপুরা ভাষার বর্ণলিপি। ছবি : সংগৃহীত
ত্রিপুরা ভাষার বর্ণলিপি। ছবি : সংগৃহীত

তিন পার্বত্য জেলার পাশাপাশি সমতলেও বসবাস করছে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, মিরসরাই, ও সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন উপজেলায় বসবাস করছেন ন্যূনতম ৬০ হাজার ত্রিপুরা। কিন্তু মায়ের ভাষার বাইরে বাংলা ভাষায় পাঠদান হওয়ায় প্রাথমিকেই ঝড়ে পড়ছে এসব শিক্ষার্থী। এমন পরিস্থিতিতে সমতলে বসবাসরত ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের স্বার্থে মাতৃভাষায় পাঠদান পদ্ধতি চালু দাবি জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি মাতৃভাষায় পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দিতেও অনুরোধ তাদের। কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে সমতলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী থেকে শিক্ষক নিয়োগ হলেই এই সংকট কাটানো যাবে বলে মনে করছেন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ। এ জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সঠিক ইতিহাস, সংস্কৃতি সংবলিত তথ্য পাঠ্যপুস্তকে উপস্থাপন করার অনুরোধ করেছেন তারা।

রোববার (৩ মার্চ) চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবির কথা জানান ত্রিপুরা ছাত্র সংসদ (টিসিএস)। এর আগে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের কাছে একটি স্মারকলিপি দেন তারা।

ত্রিপুরা ছাত্র সংসদের (টিসিএস) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধন কিশোর ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের মধ্যে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অন্যতম। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ি, ফরিদপুর এবং কক্সবাজার জেলায় বসবাস করে। এককালে ত্রিপুরা জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের আবর্তে ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর ভাষাও সংস্কৃতি দিন দিন বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে।

একই তথ্য জানান ত্রিপুরা ছাত্র সংসদের (টিসিএস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রুমিও ত্রিপুরা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গঠনের পর দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার অবস্থান ও ভাষা পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য একটি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের নৃ-ভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এ কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে মাঠপর্যায়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলা ছাড়াও আরও ৪০টি ভাষার সন্ধান পেয়েছে ইনস্টিটিউট। সমীক্ষার মাধ্যমে সবচেয়ে ভয়াবহ যে তথ্যটি উঠে এসেছে তা হলো এই ৪০ ভাষার ১৪টি বিপন্নপ্রায়। অনেকের মতে, এই বিপন্ন ভাষাগুলোর সংখ্যা আরও অধিক হবে।

রুমিও ত্রিপুরা বলেন, বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার রাজনৈতিক, সামাজিক ছাত্র সংগঠনের দাবির ফলে সরকার ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে সকল জাতিসত্তার জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার নীতিগ্রহণ করে। বহু দাবি দাওয়া ও প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালে সরকার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), সাঁওতাল (সাদরি), গারো ভাষায় শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের বই রচনা করে। বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় বই বিতরণ করা হলেও মাতৃভাষায় শিক্ষক সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব, তদারকি ও তত্ত্বাবধানের অভাবে উদ্যোগ সম্পন্নভাবে সফল হচ্ছে না।

ধন কিশোর ত্রিপুরা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় আংশিকভাবে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেলেও সমতলের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর চেয়ে সমতলে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আরও বেশি বিপন্ন। সাম্প্রতিক সময়ে সমতলের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংকটের মুখে। অনেকে নিজস্ব মাতৃভাষা হারিয়ে বাংলা ভাষায় ভাব বিনিময় করতে বাধ্য হচ্ছে। যদি সময়োপযোগী কার্যকরে কোনো উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ত্রিপুরাদের প্রাণের ভাষা ‘ককবরক’ হারিয়ে যাবে।

টিসিএস এর সভাপতি রুমিও ত্রিপুরা বলেন, ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ককবরক ভাষাসহ ৫টি ভাষার মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিসমূহের মাতৃভাষায় পাঠদানের জন্য পাঠ্য বই বিতরণ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষক সংকট, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের অভাব, তদারকি ও তত্ত্বাবধানের অভাবে তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে আংশিক সুযোগ পেলেও সমতলের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিশুরা মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

হাটহাজারী ত্রিপুরা ছাত্র সংসদের সদস্য ফুলচাঁন ত্রিপুরা বলেন, ত্রিপুরাদের ঐতিহ্য ও ভাষা রক্ষা করতে হলে চারটি কাজ করতে হবে। সমতলে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের স্বার্থে মাতৃভাষায় পাঠদান পদ্ধতি চালু করতে হবে। কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে সমতলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী থেকে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। মাতৃভাষায় পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর সঠিক ইতিহাস, সংস্কৃতি সংবলিত তথ্য পাঠ্যপুস্তকে উপস্থাপন করতে হবে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘরের মাঠে বিধ্বস্ত হয়ে বিদায় বার্সার

ঈদ করতে এসে পানিতে ডুবে কিশোরের মৃত্যু

চকরিয়ায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে কৃষককে গুলি করে হত্যা

যুবলীগ কর্মীর পায়ের রগ কাটল যুবদল নেতা 

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জের দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে আহত ২০

সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা

৮ মাসে সর্বজনীন পেনশন সদস্য ৫৪ হাজার

‘ওরাকল ক্লাউড ওয়ার্ল্ড ট্যুর সিঙ্গাপুর’ এ স্মার্ট বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরলেন পলক

সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে ২ কৃষকের মৃত্যু

পাবনায় সাংবাদিককে পিটিয়ে পা ভেঙে দিল সন্ত্রাসীরা

১০

ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্যে বিরাট সুখবর

১১

গাজীপুরে ব্যাটারি কারখানায় বিস্ফোরণে চীনা নাগরিক নিহত

১২

প্রেমিকাকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের দায়ে একজনের যাবজ্জীবন

১৩

লামায় উৎসবের দিনে আগুনে পুড়ল বৌদ্ধ বিহার

১৪

চট্টগ্রামে এখনও ঈদের আমেজ

১৫

রাবির জনসংযোগ দপ্তরের নতুন প্রশাসক অধ্যাপক প্রণব কুমার

১৬

অনৈতিক সম্পর্কের মামলায় শিক্ষকের কারাদণ্ড

১৭

নদীতে নিখোঁজ ২ বোনের মরদেহ উদ্ধার

১৮

সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যুতে প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর শোক

১৯

শ্রীমঙ্গলে তাপদাহে মানুষের নাভিশ্বাস

২০
*/ ?>
X