‘গরম খবর, গরম খবর’, ‘আজকে গরম খবর, জানতে পত্রিকা পড়ুন’- এমনিভাবে ডাকতে থাকে পত্রিকার হকার। সেই কাক ঢাকা ভোরে শহর থেকে অলিগলি রাস্তায়, বাসা বাড়ির সামনে, কিংবা গ্রামের মেঠো পথ ধরে গ্রামের হাটবাজারে পত্রিকা ফেরি করে হকাররা। হকারদের সম্পর্কে কেউ তেমন জানতে চান না। জানতে চান না তাদের সুখ-দুঃখের কথা। সমাজের আর ১০টা মানুষের মতো তাদেরও আছে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন, আছে জীবনের সুখ-দুঃখের নানা গল্প। কিন্তু তাদের জীবনপাতার গল্পগুলো লিখা হয় জীবন সংগ্রামের কাহিনি দিয়ে। নিরবে নিভৃতে তারা চালিয়ে যায় জীবন সংগ্রাম।
বাদল মিয়া তাদেরই একজন। ৬২ বছর বয়সী এই হকারের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়ি ইউনিয়নের তেলুয়ারি গ্রামে। এক মেয়ে ও তিন পুত্র সন্তানের জনক বাদল মিয়া দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে পত্রিকার হকার। পত্রিকার হকারি করেই চলে তার সংসার। ময়মনসিংহের পত্রিকা এজেন্ট মানিক মিয়ার অধীনে হকার হিসেবে কাজ করেন। তার বাড়ি থেকে কেন্দুয়া প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।
প্রতিদিন ভোরে তিনি সিএনজি নিয়ে ময়মনসিংহ স্টেশন রোডে এজেন্ট মানিক মিয়ার কাছে আসেন পত্রিকা নিতে। এখান থেকে পত্রিকা নিয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে কেন্দুয়া উপজেলার উদ্দেশ্যে সিএনজি দিয়ে পত্রিকা বিলি করেন সোহাগী, আঠারোবাড়ি, গণ্ডা, সাহিত্যপুর, মাশকা বাজার হয়ে সর্বশেষ দুপুরে পৌঁছান কেন্দুয়ায়। কেন্দুয়ায় পৌঁছে সাইকেলের প্যাডেল মেরে লুঙ্গি পরে উপজেলার আনাছে কানাছে পত্রিকা বিলি করে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়ায়। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত এমনকি ঝড়ের দিনেও তার পত্রিকা বিলি বন্ধ নেই। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে পত্রিকা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন বাদল মিয়া।
অনেক কষ্টে কাটছে তার জীবন। পত্রিকা বিক্রি করে যা উপার্জন হয় তা ছেলে মেয়ের লেখাপড়া খরচ আর পরিবারের ভরণপোষণ মেটাতেই শেষ। তার নিজস্ব স্বাদ-আহ্লাদ বলতে কিছু নেই। পত্রিকা বিক্রি থেকে যা রোজগার হয় তা দিয়ে কোনোমতে দিনাতিপাত করছেন তিনি।
হকার বাদল মিয়া জানান, ১০ বছর তখন থেকেই কেন্দুয়া উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পত্রিকা বিক্রি করে আসছেন তিনি। এখন তার বয়স ৬২ বছর। প্রতিদিন ছোট বড় প্রায় ১০০০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক প্রায় ১০০০ জন গ্রাহক রয়েছে তার। এভাবে তিনি মাসে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকার মতো আয় করেন। তা দিয়ে কোনোমতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে খেয়ে-পরে চলছে তার সংসার। পত্রিকা বিক্রি করেই ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছেন। তার একমাত্র মেয়েকে কিছু লেখাপড়া করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ছোট খাটো চাকরি করছেন। ছোট ছেলে মাধ্যমিকে পড়ছে।
বাদল মিয়া আরও জানান, নির্বাচন সময় ও এক্সক্লুসিভ খবর হলে বেশি পত্রিকা বিক্রি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন সব বুজে তাই পত্রিকাগুলোকে আরও ভালো ভালো খবর পরিবেশন করতে হবে। মানুষ আসলে খবর খুঁজে। যদি ভালো ভালো খবর পরিবেশন হয় তবে পত্রিকা ভালো চলে। মোবাইল ও ইলেকট্রিক মিডিয়ার প্রতি মানুষের এখন আগ্রহ বেশি, আগের মতো পত্রিকা পড়তে চায় না। অনেক কষ্টে দিনকাল চলছে। এ ব্যবসা করে চলা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা এখন কি করবো? ৬-৭ ঘণ্টা পত্রিকার ব্যবসা করে পাশাপাশি যদি অন্য কিছু করা যায় তাহলে চলা যাবে। অন্যথায় পরিবার পরিজন নিয়ে চলা সম্ভব নয়। সংবাদ পত্র শিল্প টিকিয়ে রাখতে আমার মতো হকারদের ভূমিকা থাকলেও হকারদের ভাগ্য পরিবর্তনে কেউ এগিয়ে আসেনি।
কেন্দুয়া রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি আসাদুল করিম মামুন বলেন, আমি সেই ছোট কাল থেকেই দেখে আসছি হকার বাদল ভাই লুঙ্গি পড়ে বাইসাইকেলে ছড়ে ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কেন্দুয়া উপজেলার বিভিন্ন বাজারে পত্রিকা বিক্রি করেন। বাদল ভাই খুব ভালো মানুষ। তবে পত্রিকা থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে খুব কষ্ট করে সংসার চালান। বাদল মিয়ার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমাজের দায়িত্বশীলদের প্রতি আহ্বান জানাই।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহের পত্রিকা এজেন্ট মানিক মিয়া বলেন, হকার বাদল মিয়া খুব ভালো মানুষ। সে দীর্ঘদিন ধরে পত্রিকা বিক্রি করছেন। বর্তমানে পত্রিকা বিক্রি অনেক কমেছে। ডিজিটাল যুগে এই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানান তিনি।
মন্তব্য করুন