পরিযায়ী পাখি শামুকখোল দুই যুগ আগেও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় সহজে দেখা যেত না। গ্রীষ্ম মৌসুমে কোথাও কোথাও এদের দেখা যেত। তবে খাদ্যাভাব না থাকায় এবং উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রজনন সুবিধার কারণে এই পাখিটি এখন উপজেলার অনেক এলাকার আনাচে কানাচে ও ক্ষেতখামারে দেখা মিলছে।
স্থানীয়রা বলছেন, পাখিগুলো এখন আর পরিযায়ী নয় বরং এরা এই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বাসা বেঁধেছে। যে কারণে এই উপজেলায় বেড়েছে শামুকখোলের সংখ্যা। যার ফলে উপজেলার বিভিন্ন ফসলি মাঠে এই পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, এক সময় এই উপজেলায় শামুকখোল মূলত গ্রীষ্মকালে দেখা যেত। যে কারণে এই পাখিটিকে যাযাবর বা পরিযায়ী পাখি বলা হতো। সে সময় এরা প্রজনন শেষে একটা নির্দিষ্ট সময় পর এই এলাকা ছেড়ে চলে যেত। তবে গত কয়েকবছর ধরে শামুকখোল এই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছে। প্রতিদিন ফসলি মাঠে ও উন্মুক্ত আকাশে পাখিগুলোর ঝাঁকবেধে ওড়াউড়ির দৃশ্য এই উপজেলার প্রাকৃতিক পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে। পাখিগুলো মাঠে মাঠে গিয়ে ও অল্প জল আছে এমন জলাশয়ে গিয়ে শামুক খুলে খায়। পাখিগুলো এই পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে নিয়েছে।
শামুকখোল পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Anastomus oscitans। এই পাখির ঠোঁটের সঙ্গে অন্যকোনো পাখির ঠোঁটের মিল নেই। শামুকখোল পাখির উপরের অংশের সঙ্গে নিচের অংশে বেশ ফাঁকা। এরা এই বিশেষ ধরনের ঠোঁট দিয়ে শামুক তুলে শামুকের ঢাকনা খুলে ভেতরের নরম অংশটুকু খায়। শামুক খোলার এই শৈল্পিক কৌশলের কারণেই এই পাখিটির নামকরণ করা হয়েছে শামুকখোল। তবে স্থানীয়রা এই পাখিকে শামুককাচা নামেই চেনে।
জানা গেছে, শামুকখোল পাখি খুবই নিরীহ প্রজাতির একটি পাখি। এরা স্বজাতির মধ্যে কখনো মারামারি করে না। এরা শব্দ করে ডাকতেও পারে না। এদের বাহ্যিক চেহারা দেখে স্ত্রী-পুরুষ নির্ণয় করা যায় না। দেখতে এদের একরকমই দেখা যায়। এদের গায়ের রঙ সাদাকালো। তবে বয়স্ক পাখিদের গায়ের রঙ অনেকটা কালচে রঙের হয়ে থাকে। এরা দুটি বাসা বাঁধে, তবে মূলত স্থায়ী বাসা একটিই হয়। তবে প্রজননের সময় ছাড়া এরা বাসাতে অবস্থান করে না। অন্যসময় এরা জলাশয়ের আশপাশের গাছের উঁচু ডালে খোলা অবস্থায় থাকতে পছন্দ করে। এদের জলচর পাখি বলা হলেও অন্যান্য জলচর পাখিদের মতো এরা পানিতে সাঁতার কাটে না।
স্থানীয় বাসিন্দা আক্তারুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, শামুকখোল পাখিগুলো ভোরবেলা দলবেঁধে ওড়াউড়ি করে বিভিন্ন ফসলি মাঠে গিয়ে খাবার সন্ধান করে। এরা বেশিভাগ শামুক খায়। এ ছাড়া এরা ছোট মাছ, কাঁকড়া, ব্যাঙ খেয়ে জীবন ধারণ করে। প্রতিদিন পাখিগুলোর দলবেঁধে ওড়াউড়ির দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগে।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা উপজেলার সীমান্তবর্তী দর্পণারায়ণপুর এলাকার শাহজাহান কালবেলাকে বলেন, গত কয়েকবছর ধরে শামুকখোল পাখিদের সচরাচর চোখে পড়ছে। এর আগে এই পাখিগুলো এই এলাকায় তেমন একটা দেখা যেত না। বক পাখির মতো পাখিগুলো ক্ষেতখামারে ও অল্প জল আছে এমন জলাশয়ে ওড়াউড়ি ও বসে থাকতে দেখা যায়। পাখিগুলো গাছের উঁচু ডালে বসবাস করে।
চান্দলা মডেল হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. অপু খান চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশে অন্য দেশ থেকে নানা জাতের অতিথি পাখি আসে। কোনো কোনো পাখি শীতকালে ও কোনো কোনো পাখি গরমকালে আসে। শামুকখোল পাখিও অতিথি পাখি। তবে বসবাস উপযোগী পরিবেশ পাওয়ায় ধিরে ধিরে পাখিগুলো এই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা যাচ্ছে। এতে পরিবেশের সমৃদ্ধির দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে পাখিগুলোর প্রতি আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পাখিপ্রেমী ডা. আবু হাসনাত মো. মহিউদ্দিন মুবিন কালবেলাকে বলেন, পাখি প্রকৃতির সম্পদ। পাখি পরিবেশ ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে তাদের আবাসস্থল তৈরি করে থাকে। শামুকখোল একটি পরিযায়ী পাখি। এই পাখি বাংলাদেশে গ্রীষ্মকালে দেখা যায়। তবে এই উপজেলায় গত কয়েক বছর ধরে শামুকখোল পাখির বিচরণ লক্ষ্য করা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে পাখিগুলো এই এলাকার পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে, তাই পাখিগুলোকে এই এলাকায় আবাসস্থল তৈরি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন