

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে একটি শব্দ— গানম্যান।
সম্প্রতি ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি নিহত হওয়ার পর রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলনকর্মী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। নির্বাচনের আগে এমনিতেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা আশঙ্কা ছিল। তার মধ্যে গানম্যান চাওয়া ও দেওয়ার খবর সেই উদ্বেগকে সামনে এনে দিয়েছে আরও স্পষ্টভাবে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। পাশাপাশি নিজ নিজ নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন অনেকে। কেউ গানম্যান চেয়েছেন, কেউ আবার ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স।
এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের জন্য গানম্যান নিয়োগ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আরও কারা ঝুঁকিতে রয়েছেন, সেই বিষয়টি পুলিশের বিশেষ শাখা যাচাই করছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
এদিকে নির্বাচন সামনে রেখে গানম্যান নিয়োগ কিংবা ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে কি না— সে প্রশ্নও উঠছে নানা মহলে।
অনেকে বলছেন, ব্যক্তি বিশেষকে গানম্যান দেওয়ার চেয়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার সময় আপনি কয়জনকে নিরাপত্তা দেবেন? আমেরিকার মতো জায়গায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পর্যন্ত হিট করেছে। তার তো গানম্যান কম ছিল না।’
কীভাবে পাওয়া যায় গানম্যান
বাংলাদেশে গানম্যান বা বডিগার্ড পাওয়া কোনো ঢালাও অধিকার নয়। বিষয়টি নির্ভর করে ব্যক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ওপর। সরকারের বিশেষ বিবেচনায় এটি অনুমোদিত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলে যে কাউকে তার নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় গানম্যান বরাদ্দ দিতে পারে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, গুরুতর হুমকি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সরকার নিজ উদ্যোগেও নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।
পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সাধারণ নাগরিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি লিখিতভাবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন। আবেদন পাওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থা বা স্পেশাল ব্রাঞ্চ যাচাই করে দেখে, আবেদনকারীর প্রকৃতপক্ষে নিরাপত্তা প্রয়োজন আছে কি না, নাকি এটি কেবল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ ও কঠোর।
সাধারণত মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রোটেকশন ইউনিট থেকে বডিগার্ড এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ থেকে গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘বডিগার্ড সাধারণত প্রোটেকশন ইউনিট থেকে আসে, আর গানম্যান দেওয়া হয় বিশেষ শাখা থেকে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ জানান, সব যাচাই শেষে পুলিশের প্রশিক্ষিত সদস্যকে গানম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে যার জন্য নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, তার মতামতকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘সরকার নিয়োগ দিলেও গানম্যান হিসেবে কাকে দেওয়া হবে—সে ক্ষেত্রে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়। কারণ এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় থাকে।’
একজন গানম্যান সরকারি অস্ত্র ব্যবহার করেন এবং তার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক গুলি বরাদ্দ থাকে। গানম্যানের বেতন ও অন্যান্য খরচ বহন করে সরকার। তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
কারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গানম্যান পান
রাষ্ট্রীয় প্রটোকল অনুযায়ী রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি গানম্যান বা সশস্ত্র দেহরক্ষী পেয়ে থাকেন। এই তালিকায় রয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সামরিক বাহিনীর প্রধানরা।
পুলিশের সাবেক প্রধান নুরুল হুদা বলেন, ব্যক্তি বিভিন্নভাবে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারেন। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান বা বডিগার্ড দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
তার ভাষায়, ‘নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত অস্বাভাবিক নয়। তবে যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে তার প্রকৃত ঝুঁকি যথার্থ হওয়া দরকার।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালতের কাছেও গানম্যান বা পুলিশি নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করা যায়।
তিনি বলেন, ‘কোনো নাগরিক যদি মনে করেন তার জীবন বিপন্ন, তবে তিনি গানম্যানের জন্য আবেদন করতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে কাকে কীভাবে নিরাপত্তা দেওয়া হবে— সে সিদ্ধান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের।’
ব্যক্তিগত ব্যবস্থায় নিরাপত্তা
অনেকে নিজস্ব বেতনভুক্ত লোক দিয়েও গানম্যানের কাজ করান। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির নিজের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকতে হবে অথবা নিয়োগকর্তার অস্ত্রের লাইসেন্সে তাকে ‘রিটেইনার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সরকার অনুমোদিত বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকেও নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে গানম্যান নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে আলাদা অনুমতি প্রয়োজন।
অতীতের অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশে অতীতেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিশেষ বিবেচনায় গানম্যান নিয়োগের নজির রয়েছে। ২০১৪ সালে মুক্তমনা লেখক, প্রকাশক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড ও হুমকির ঘটনায় সরকার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। সে সময় ২৬২ বিশিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তায় সাদা পোশাকে গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যে এমনটাই জানা যায়।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
মন্তব্য করুন