ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান
প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৩, ১০:১৫ এএম
আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৩, ০৭:১৯ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামানের সাক্ষাৎকার

সংঘাত রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান । ছবি: সংগৃহীত
ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান । ছবি: সংগৃহীত

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক।সংসদীয় প্রক্রিয়া, বিরোধী দলের রাজনীতি, রাজনৈতিক দলের কার্যাবলি, তুলনামূলক রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে বড় দলগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান বিষয়ে কালবেলার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম

কালবেলা: বিএনপি ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও একই দিন শান্তি সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে। এটি কি সাংঘর্ষিক রাজনীতির কোনো বার্তা প্রদান করছে কী?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: বিএনপি একদফা দাবি আদায়ে পর্যায়ক্রমে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বড় জমায়েতের লক্ষ্য রয়েছে। দুটি বড় দলের সমাবেশই একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে মনে হচ্ছে।

দুটি প্রধান দলের সমাবেশ একই দিনে হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যদি এই সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হয় হবে তা সবার জন্যই মঙ্গলজনক হবে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ হলে তা রাজনৈতিক নৈরাজ্য থেকে একধরনের উত্তরণ হিসেবেও দেখা যাবে। আর সংঘাত হলে সেটা পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।

একইসঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত হলে তা চলমান রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলবে। দুটি দল কীভাবে তাদের কর্মসূচি শেষ করে সেদিকে দেশবাসী তাকিয়ে আছে। এখন যা দেখছি তা হলো, দেশ একটা সংঘাতময় রাজনীতির মুখোমুখি। বিষয়গুলো সামনের দিনগুলোতে আরও পরিষ্কার হবে।

কালবেলা: অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার ইস্যুতে বিএনপির আন্দোলন এবং সরকারের অবস্থান কী আমাদের অতীতের রাজনৈতিক সংঘাতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: ১৯৯৬ সালে ঠিক এভাবেই তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। তারা হরতাল, অবরোধসহ নানাভাবে জোরালো আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করেছিল। বিএনপি বাধ্য হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক রূপ দিতে।

সে সময় অনেক সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। সেদিনের আওয়ামী লীগের অবস্থান এবং আজকের বিএনপির অবস্থান দুটোকে সমানভাবেই দেখা যায়। দুটি সময়ই আন্দোলনগুলো ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক, ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে।

এরপর ২০০৬ সালেও নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে দেশে বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিচারপতি কেএম হাসানকে দায়িত্ব না দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন সমাবেশের ডাক দেয় আওয়ামী লীগ। একই সময়ে, একই স্থানে পাল্টা সমাবেশের ডাক দেয় বিএনপি-জামায়াত জোট। ফলে সংঘাত দেখা দেয়। সংঘর্ষে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সেই দুঃসহ স্মৃতি থেকে মানুষ এখনও আশঙ্কায় থাকেন যদি দুটি দল পাল্টাপাল্টি সমাবেশের কর্মসূচিতে যায়, তাহলে আবার সংঘাত দেখা দেবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে দুটি দলের মধ্যে আমরা সাংঘর্ষিক অবস্থান দেখতে পাচ্ছি। দলগুলোর মধ্যে মেরুকরণ হচ্ছে এবং একধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

কালবেলা: আগের দুটি নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচন পরিস্থিতিটা কি আপনার কাছে ভিন্ন মনে হচ্ছে?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: এই নির্বাচনকে গত দুটি নির্বাচন থেকে ভিন্ন রকম করার একধরনের অঙ্গীকার সরকার নিজেও করছে এবং বিরোধী দলও চায় এবারের নির্বাচন একেবারে ভিন্ন রকম হোক। তবে নির্বাচন ঠিক কীভাবে হবে, কেমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে; সেটা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। যে সংকট এই মুহূর্তে চলছে তার সমাধানের ওপর নির্ভর করছে আগামী নির্বাচন কেমন রূপে হতে পারে।

১৯৯১ সালে দেশে যখন সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলো, তখন সবার আশা ছিল যে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের চর্চা করবে এবং একে শক্তিশালী করবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সবসময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই চায় না। ধীরে ধীরে এটাই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণে প্রধান দুটি দলের মধ্যে আস্থাহীনতা বাড়তে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত সংঘাতময় রাজনীতির দিকে নিয়ে গেছে।

কালবেলা : বিদেশি কূটনীতিকরা যে ধরনের কথা বলছেন বা যে ধরনের বার্তা দিচ্ছেন; তা কি নির্বাচন বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে বলে আপনি মনে করেন?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: নির্বাচন কীভাবে বা কোন পদ্ধতিতে হবে, প্রকৃতপক্ষে সে ধরনের কোনো পরামর্শ বিদেশিদের থেকে আমরা লক্ষ করিনি। তবে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শক্তির একধরনের সংশ্লিষ্টতা বাড়ছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি। একই সঙ্গে নির্বাচনের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে একটু মেরুকরণ হচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বার্থ এখানে জড়িত হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বের বক্তব্য এবং পরামর্শ প্রদান বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই অর্থে বিদেশিদের সংশ্লিষ্টতা বাড়ছে।

কালবেলা: আগামী নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে কী?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: একেবারে অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। এখনই সেটা বলা যাবে না। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে তখন নতুন প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো কী ধরনের আচরণ করে ,তার ওপর নির্ভর করছে নির্বাচন অনিশ্চিত হবে কি না।

বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং নানামুখী চাপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন মোড় দিতে পারে। নির্বাচনের নিশ্চয়তার দিকটি এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে।

কালবেলা: দুটো দলের অনড় পরিস্থিতিতে কীভাবে নির্বাচন হতে পারে?

ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান: আমরা জানি দুটি দলই তাদের অবস্থানে অনড়। তারা তাদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ, দুপক্ষের এই অনড় অবস্থান আজ নতুন নয়। আমরা বরাবরই তাদের মধ্যে একধরনের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক দেখে আসছি। একধরনের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক দেখে আসছি। নির্বাচন যখন ঘনিয়ে আসে তখন এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের একটি মৌলিক বিষয় হিসেবে নির্বাচন অন্যতম। সেটি নিয়েই এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যে মতৈক্য হচ্ছে না। রাজনীতি সচেতন মানুষ মনে করেন, একটি পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট হওয়া উচিত। আর আপাতত এই সমাধানটি তাৎক্ষণিক হলেও এর একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া দরকার।

রাজনীতিকে সুস্থ করা দরকার। যে সংকটমূলক পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি তার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। যেহেতু আমাদের দেশে অবিশ্বাসের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিদ্যমান এ জন্য একধরনের সমঝোতা গড়ে তোলা আবশ্যক। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এটা একদিনে হবে না। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সমন্বয় ঘটাতে হবে। শুধু বড় দুটি রাজনৈতিক দল নয়, একইসঙ্গে সমাজের অন্যান্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে যেমন, নাগরিক সমাজ সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাকৃবিতে রেললাইন অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা

আশঙ্কাজনক অবস্থায় জবির গুলিবিদ্ধ চার শিক্ষার্থী 

অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ দেবে অটোবি, পদসংখ্যা ২০

কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, জামায়াতের নিন্দা

চট্টগ্রামে কোটা আন্দোলনে দুইজন নিহত

কোটার বিষয়ে আদালতকে পাশ কাটিয়ে কিছুই করবে না সরকার : আইনমন্ত্রী

মতিউর পরিবারের ১৯টি কোম্পানির শেয়ার অবরুদ্ধ 

ঢাবি প্রক্টরিয়াল কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত

কোটা সংস্কার আন্দোলনে বরিশাল ব্লকেড

বেসিসের ফিনটেক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ার হলেন নগদের ইডি এলিট

১০

আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েনি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ

১২

১৩ থেকে ২০তম গ্রেডে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চাকরির সুযোগ

১৩

জবি শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলি, আহত ৪

১৪

জাবিতে চলমান আন্দোলনে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের সংহতি

১৫

জামালপুরে ছাত্রলীগের সমাবেশে হামলা, আহত ১

১৬

রংপুরে কোটা আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী নিহত

১৭

সরকার হটাতে কোটা আন্দোলনকারীদের দলে ভেড়াতে চায় ছাত্রদল

১৮

অবরোধে অচল ঢাকা

১৯

জবিতে লাঠিসোঁটা নিয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের অবস্থান 

২০
X