আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

‘আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে মব নিয়ন্ত্রণ জরুরি’

আহসান হাবিব বরুন। ছবি : সংগৃহীত
আহসান হাবিব বরুন। ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচনের প্রাক্কালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাবের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা এবং নায়েব সুবেদার মো. মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার মর্মান্তিক প্রাণহানি কোনো বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর মবতন্ত্রের ছোবলের একটি সতর্কবার্তা। এই ঘটনায় শুধু একজন সাহসী কর্মকর্তার জীবনই ঝরে যায়নি; প্রশ্নের মুখে পড়েছে আইনের শাসন এবং আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা।

ঘটনাটি ঘটেছে এমন সময়, যখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়ার কথা ছিল নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও জনগণের আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করা। অথচ আমরা দেখলাম, মাইকে ঘোষণা দিয়ে এলাকাবাসীকে উসকে র‍্যাবের ওপর হামলা চালানো হলো। এটি কেবল একজন কর্মকর্তার মৃত্যু নয়; এটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত।

জঙ্গল সলিমপুর বহুদিন ধরেই রাষ্ট্রের জন্য এক ধরনের ‘নো-গো এরিয়া’। চার দশক ধরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি, ভূমিদস্যুদের দখল-বাণিজ্য, সশস্ত্র পাহারা, পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ নিষেধ— সব মিলিয়ে এটি কার্যত একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। পুলিশ, জেলা প্রশাসন, এমনকি সাংবাদিকরাও এখানে হামলার শিকার হয়েছেন। ২০২২, ২০২৩ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনের ওপর একের পর এক আক্রমণ প্রমাণ করে— আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হুমকির মুখে।

র‍্যাবের অভিযানে হামলা এবং একজন কর্মকর্তার মৃত্যু সেই ধারাবাহিকতারই সবচেয়ে রক্তাক্ত অধ্যায়। এটি দেখিয়ে দিল, যখন মবতন্ত্র শেকড় গাড়ে, তখন তা আর স্বতঃস্ফূর্ত থাকে না; বরং সংগঠিত হয়, নেতৃত্ব পায়, অর্থ ও অস্ত্রের জোগান পায়।

মবতন্ত্র এখন আর কেবল জনতার ক্ষণিক উত্তেজনা নয়। এটি হলো আইন, নৈতিকতা ও যুক্তির পরিবর্তে সংখ্যার শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা। এখানে অপরাধীর বিচার হয় আদালতের পরিবর্তে রাস্তায়; সিদ্ধান্ত আসে সংবিধান বা রাষ্ট্র থেকে নয়, মাইকের ঘোষণায়।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁ তার বিখ্যাত গ্রন্থ The Crowd : A Study of the Popular Mind-এ লিখেছিলেন : ‘Crowds are only powerful for destruction.’ অর্থাৎ, ‘ভিড়ের শক্তি মূলত ধ্বংসের জন্যই ব্যবহৃত হয়।’

জঙ্গল সলিমপুরের ঘটনায় আমরা ঠিক সেই ধ্বংসাত্মক শক্তিরই বাস্তব রূপ দেখেছি। র‍্যাব সেখানে গিয়েছিল আইন প্রয়োগ করতে; ফিরে এসেছে লাশ ও রক্ত নিয়ে।

পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ আশা করেছিল— আইনের শাসন, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক চর্চা ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি এক ধরনের শাসনগত শূন্যতা। সেই শূন্যতায় ঢুকে পড়েছে মবতন্ত্র।

কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, কোথাও ধর্মীয় উসকানি, কোথাও ভূমি দখল, কোথাও সাংবাদিক নির্যাতন চিত্র। প্রশাসন যখন নীরব, তখন মব নিজেই বিচারক, জল্লাদ ও শাসক হয়ে ওঠে। মবতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে আর একমুহূর্ত দেরি করার সুযোগ নেই। কারণ, এটি একসময় নিয়ন্ত্রণহীন দানবে পরিণত হবে। আজ সে র‍্যাবকে আক্রমণ করছে; কাল অন্যকে করবে; পরশু আরেকজনকে গ্রাস করবে। এই মবসন্ত্রাস কাউকে ছাড় দেবে না।

এই প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। ঘটনার পর শোক, তদন্তের আশ্বাস, দোষীদের শনাক্ত করার ঘোষণা শোনা যায়। কিন্তু দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন : ‘The state is the entity that claims the monopoly of the legitimate use of physical force.’ অর্থাৎ, ‘রাষ্ট্র হলো সেই সত্তা, যা বৈধভাবে বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার দাবি করে।’

যখন ৪০০-৫০০ জনের একটি দল মাইকে ঘোষণা দিয়ে র‍্যাবের ওপর হামলা চালাতে পারে, তখন তা একচেটিয়া অধিকার কার্যত প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অনেকে মবের কর্মকাণ্ডকে ‘জনতার ক্ষোভ’ বা ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ বলে হালকা করার চেষ্টা করেন। এটি বিপজ্জনক বিভ্রান্তি। গণতন্ত্র মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন হলেও তা আইনের সীমার ভেতরে। মবতন্ত্র মানে সেই সীমা ভেঙে ফেলা। মবতন্ত্র একটি বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে; এখানে সত্য-অসত্যের বিচার হয় না, আবেগই চূড়ান্ত সত্য হয়ে ওঠে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাবের ওপর হামলা এবং একজন কর্মকর্তার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— মবতন্ত্র এখন আর প্রান্তিক সমস্যা নয়; এটি আইনশৃঙ্খলার উপরও আঘাত হানছে। আজও যদি আমরা নীরব থাকি, তবে আগামীকাল এই দানব আরও বড় হবে, আরও হিংস্র হবে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে রাষ্ট্রের সামনে এটি একটি পরীক্ষা। মবতন্ত্রকে যদি এখনই থামানো না যায়, তবে গণতন্ত্র, আইন ও নিরাপত্তা— সবকিছুরই মূল্য দিতে হবে।

(লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৪৬তম বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার্থীদের জরুরি নির্দেশনা পিএসসির

এআই ভিডিও এবং অপতথ্য নির্বাচন ও নিরাপত্তায় হুমকি

অস্ট্রেলিয়ায় গোলাগুলিতে নিহত ৩, হামলাকারী পলাতক

বিশ্ব ক্রিকেট কাঁপিয়ে দেওয়া বাংলাদেশের ‘উত্তাল’ ২০ দিন   

গ্রিনল্যান্ড কার হাতে যাবে, তা রাশিয়ার বিষয় নয় : পুতিন

বিএনপির ৫ কর্মসূচির ঘোষণা, নেবে মতামত ও পরামর্শ

‘ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে বিএনপি’

ড. খলিলের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক, মন্তব্যে চীনের প্রতিবাদ

জাকাতের বিধান ও সমকালীন মাসায়েল নিয়ে নতুন গ্রন্থ ‘জাকাত’

জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ড্যাবের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প 

১০

নির্বাচনের ছুটি পাবেন না যারা

১১

চেকপোস্টে গুলি উদ্ধার, পরে আইনজীবীর বাসায় মিলল অবৈধ পিস্তল

১২

তাদের প্রটোকল বিএনপির চাইতে ৩ গুণ করে দিন : তারেক রহমান

১৩

বিশ্বকাপ বয়কট করলে যে ক্ষতি হতে পারে বাংলাদেশের

১৪

বিপথগামীর জন্য কারাগার হবে সংশোধনাগার : কারা মহাপরিদর্শক

১৫

বিএনপির নির্বাচনী জনসভায় শাবিপ্রবি ভিসি প্রোভিসি রেজিস্ট্রার

১৬

সাংবাদিক আনিস আলমগীরের জামিন নামঞ্জুর

১৭

নির্বাচনী প্রচারণা / সিলেটের দুই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিএনপির লিফলেট বিতরণ

১৮

শাকিব খানের শিডিউলে নেই রায়হান রাফি

১৯

উপদেষ্টা পরিষদে ১১ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ ও নীতি অনুমোদন

২০
X