সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক নিজেদের তৈরি গাইডলাইনই মানতে পারছে না। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে হওয়া অনেক উদাহরণই তুলে ধরে আওয়ামী লীগের ওয়েব টিমের সমন্বয়ক তন্ময় আহমেদ ফেসবুকের ব্যর্থতা সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, মেটা আওয়ামী লীগ ও সরকারের নামে এ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভুল তথ্য ছড়িয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে তন্ময় অভিযোগ করেছেন, গত কয়েকটি নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে ঘৃণাত্মক বক্তৃতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্ররোচনা, অগ্নিসংযোগের আহ্বান রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে ফেসবুক। দেশের সুশীল সমাজও এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে।
তন্ময় তার পোস্টে ফেসবুকে পাওয়া শত শত লিঙ্কের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যদেরসহ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, ওই পেজ এবং অ্যাকাউন্টগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইআরই-এনডিআই থেকে হওয়া জরিপও প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে কুৎসা ছড়ানো হচ্ছে। মেটার এ বিষয়টিকে আমলে নেওয়া উচিত।
নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা তথ্যের সত্যতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে তন্ময় আহমেদ বলেন, কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধান করতে পারে যে কেন এই গুজবের বাঁধ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেছে। কেন এ তৃতীয় পক্ষটি কোনো নিরপেক্ষ অবস্থানের পরিবর্তে একটি রাজনৈতিক দলের সুরে সুর মেলাচ্ছে। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবিরের দ্বারা নির্মম হামলার পর শরীরে ১৩০টির বেশি সেলাই লাগে তন্ময়ের। সম্প্রতি তিনি একটি লাইভ ব্রডকাস্টে এসে সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি বিএনপি-জামায়াত কর্মীদের দ্বারা হামলা এবং প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেন।
তন্ময় বলেন, অতীতে বিএনপি-জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আমার বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকিও দিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ফেসবুক তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
তন্ময় বিএনপি জামায়াতের পক্ষ থেকে ছড়ানো গুজবের বিষয়টিকে ব্যাখা করার পাশপাশি আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিএনপির কেমন গুজব ছড়ায় তাও উল্লেখ করেছেন। সেইসঙ্গে নেটিজেনদের বিএনপি ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট পেজগুলো থেকে গুজব তথ্যগুলো ঘেঁটে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি জানান, বাঁশেরকেল্লা এবং বিএনপি-জামায়াতের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলোকে গুজব ছড়ানো ও সহিংসতা উসকে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য অফিসিয়াল ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে এমন একাধিক মিডিয়া রিপোর্টের উদ্ধৃতি একটি ব্যানারে উপস্থাপন করেছেন তন্ময় আহমেদ। যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপির সহিংসতা উসকে দেওয়ার সংবাদ প্রতিবেদনগুলো একত্রিত করে তিনি শিরোনামে লেখেন, মেটা কী গোপন করতে চায়?
বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তন্ময় বলেন, বাংলাদেশে আমি একা ফেসবুকের পক্ষপাতদুষ্টতা নিয়ে আপত্তি করছি তা নয়। বরং দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধাপরাধবিরোধী এবং মানবাধিকার কর্মীরা তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে আসছেন।
সম্প্রতি তন্ময় ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোয় একটি ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে বিবৃতিতে দেয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ- ’৭১। ওই পেজটি উদ্বোধন করেন যুদ্ধাপরাধীর বিচার ভণ্ডুল করতে নিযুক্ত এক বিদেশি আইনজীবী এবং লবিস্ট।
বেশ কিছু মানবাধিকার কর্মীও বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট এবং পেজগুলো থেকে গুজব ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য ছড়ানো বন্ধ করতে না পারায় ফেসবুকের নিন্দা করেছেন। আর তারাও তন্ময়ের মতো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রধান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে আগে বিএনপির ক্যাডাররা রাস্তায় তাণ্ডব চালিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হত্যা করেছে, যানবাহন ও ট্রেনে অগ্নিসংযোগ করেছে, নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে। ফেসবুক বাংলাদেশে ভোটার ও প্রগতিশীলদের ওপর হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে এ সময়ে। সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য কাজ করা নেতারা বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, ফেসবুক উসকানি ও ঘৃণামূলক বক্তব্যের বিস্তার বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা বলছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সাম্প্রদায়িক হামলার জন্য কোনো বাধা ছাড়াই এই প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করেছে।
কিন্তু এই অভিযোগগুলো উপেক্ষা করে মেটা যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে তা স্পষ্টতই রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হয়। এতে বস্তুনিষ্ঠতা এবং ন্যায্যতার অভাব রয়েছে। আর ফেসবুকের এই ব্যাখ্যা শেয়ার করছে বিএনপির হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারীরা। আর এর মাধ্যমে ফেসবুকের পক্ষপাতিত্ব পুরোপুরি ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ফেসবুক জনপ্রিয় হতে শুরু করলে আমরা দেখেছি, এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা সারা দেশে হামলা করেছে। কিন্তু ফেসবুক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যা তাদের ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে। বিএনপি-জামায়াতের প্রতি সুস্পষ্ট পক্ষপাতের এ ইঙ্গিতই বুঝিয়ে দেয় কীভাবে প্ল্যাটফর্মটি বিশ্বের অন্যান্য অংশে ঘৃণাত্মক বক্তব্য এবং সহিংসতা রোধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
মন্তব্য করুন