

চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর যেভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশিরা, তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমানকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক দালাল রাশিয়ায় পাঠান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি নিজেকে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখভাগে দেখতে পান।
এপি জানায়, বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেসামরিক চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রাশিয়ায় আনা হয়। পরে জোরপূর্বক তাদের যুদ্ধে নামানো হয়। অনেককে কারাদণ্ড, মারধর কিংবা মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হয় ।
মাকসুদুর রহমানসহ তিন বাংলাদেশি যুবক জানান, মস্কো পৌঁছানোর পর তাদের রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করানো হয়। মূলত সেগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাদের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে ড্রোন যুদ্ধ, অস্ত্র ব্যবহার ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রহমান আপত্তি জানালে এক রুশ কর্মকর্তা অনুবাদ অ্যাপের মাধ্যমে বলেন, তোমাদের এজেন্টই তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনে নিয়েছি। এরপর জোর করে তাদের যুদ্ধের সম্মুখ সারিতে পাঠানো হতো। মালামাল বহন, আহতদের উদ্ধার ও মৃতদেহ সংগ্রহে বাধ্য করা হতো।
রহমান বলেন, কাজ না করলে তাদের ১০ বছরের জেলের হুমকি দেওয়া হতো এবং মারধর করা হতো। সাত মাস পর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরেন।
কতজন বাংলাদেশি এভাবে প্রতারিত হয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, তারা শতাধিক বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করতে দেখেছেন।
এপির প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ভারত, নেপালসহ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরও এভাবে নিয়োগ করা হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী মোহান মিয়াজি জানান, তাকে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে সেনাবাহিনীতে নেওয়া হয়। পরে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। আদেশ না মানলে তাকে নির্যাতন করা হতো। ভাষা না বোঝার কারণে ভুল করলে নির্মমভাবে মারধর করা হতো বলেও জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুরের অনেক পরিবার এখনো নিখোঁজ স্বজনদের পাঠানো কাগজপত্র ধরে রেখে আশায় আছেন, একদিন তারা ফিরে আসবেন।
সালমা আক্তার তেমনি একজন ভুক্তভোগী। তিনি জানান, তার স্বামী আজগর হোসেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ায় যান লন্ড্রি কর্মীর চাকরির আশায়। পরে জানান, তাকে জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। শেষবার তিনি স্ত্রীকে বলেছিলেন, আমার জন্য দোয়া করো।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের সহায়তাকারী সংস্থা ব্র্যাক ২০২৪ সালের শেষ দিকে বিষয়টি তদন্ত করে অন্তত ১০ জন নিখোঁজ শ্রমিকের তথ্য পায়। ব্র্যাকের কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম বলেন, এখানে দুই থেকে তিন স্তরের দালালচক্র আছে।
বাংলাদেশ পুলিশও একটি মানবপাচার চক্রের সন্ধান পেয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে মারা গিয়ে থাকতে পারেন। তদন্তে দেখা গেছে, স্থানীয় এজেন্টরা কেন্দ্রীয় দালালের মাধ্যমে শ্রমিকদের রাশিয়ায় পাঠাত।
মন্তব্য করুন