

২০২৫ সাল বিশ্ব রাজনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তনের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন ও জোটব্যবস্থার মারাত্মক দুর্বলতা—এই দুই প্রবণতাই বছরটি বিশ্বকে কার্যত উল্টে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো আন্তর্জাতিক আইন, মুক্ত বাণিজ্য কিংবা নিরাপত্তা জোটের রক্ষক হিসেবে ভূমিকা রাখেনি। বরং শক্তির রাজনীতিকে সামনে এনে দেশটি নিজেই সেই বিশ্বব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যা তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে তুলেছিল।
আন্তর্জাতিক নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রের পিছু হটা: ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন একের পর এক পদক্ষেপ নেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদেরও বিস্মিত করে। কানাডা ও ডেনমার্কের মতো মিত্র দেশের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহ, ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্রদের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের আচরণ ছিল আগ্রাসী।
এ বছর যুক্তরাষ্ট্র আবারও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে যুদ্ধ আইন ও মানবাধিকার ইস্যুতে আগের কঠোর অবস্থান থেকেও পিছিয়ে আসে, বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ক্ষেত্রে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ও রাশিয়ার সুবিধা: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ২০২৫ সালেও অব্যাহত ছিল। বিপুল প্রাণহানি সত্ত্বেও রাশিয়া সামান্যই অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে মস্কো কিছুটা লাভবান হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আপসকামী মনোভাব দেখিয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একাই বড় দায়িত্ব নিতে হয়েছে। ডিসেম্বরে ইইউ ইউক্রেনকে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তার ঘোষণা দেয়।
চীন ও বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য: ২০২৫ সাল চীনের জন্য তুলনামূলক স্বস্তির বছর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সত্ত্বেও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়, যার ফলে ট্রাম্প প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত নীতির কারণে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ না করার কৌশল নেয়। তবে চীনের নেতৃত্বে কোনো শক্তিশালী জোট গড়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ দেশই এখন নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
বিশ্বায়ন ভাঙেনি, বদলেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য কিছুটা কমলেও বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশ পাল্টা শুল্ক আরোপে যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ‘ডি-গ্লোবালাইজেশন’ নয়, বরং ‘ডি-আমেরিকানাইজেশন’—অর্থাৎ বিশ্বায়ন চলছে, কিন্তু তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমছে।
এআই উন্মাদনা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি: ২০২৫ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ থেকে। ডাটা সেন্টার, শক্তিশালী কম্পিউটিং ও এআই গবেষণায় বিপুল অর্থ ঢালা হয়েছে। তবে উৎপাদনশীলতায় এআইয়ের বাস্তব সুফল এখনো সীমিত।
এ কারণে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ‘এআই বুদবুদ’ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অতীতে ডটকম বুম বা রেলওয়ে বুমের মতো অতিরিক্ত আশাবাদ শেষ পর্যন্ত বড় ধসের কারণ হয়েছিল—এমন সতর্কতাও উচ্চারিত হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, নজর ২০২৬ সালের দিকে: বিশ্লেষকদের মতে, এআই দীর্ঘমেয়াদে জীবনমান উন্নত করতে পারে, তবে স্বল্পমেয়াদে চাকরি হারানো ও বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। একই সঙ্গে শক্তির রাজনীতি ফের বিশ্ব মঞ্চে প্রধান হয়ে উঠেছে।
এ অবস্থায় ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনই ঠিক করে দেবে—‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি সাময়িক না দীর্ঘমেয়াদি এবং বিশ্ব আবার কোনো স্থিতিশীল ব্যবস্থার দিকে ফিরতে পারবে কি না।
মন্তব্য করুন