রাফিয়া বিনতে আলম পড়ছে চট্টগ্রাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে। রান্না তো বটেই, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, বিতর্কসহ মহাকাশ গবেষণাতেও ঝোঁক তার। তবে রান্নার প্রতি ভালোবাসাটা একটু বেশিই বলা যায়। এরই মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি প্রতিযোগিতায় হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। তার গল্পগুলো শুনেছেন মারুফ হোসেন।
অনেক দিন আগের কথা। ছোট্ট রাফিয়ার কানে আসছিল মেজো বোনের কাজলা দিদির আবৃত্তি। খুব আগ্রহ নিয়ে সেটা শুনছিল রাফিয়া। তার মন ছুঁয়ে যায় কবিতাটি। রাফিয়াও পড়তে লাগল। পড়তে পড়তে একদিন মুখস্থই হয়ে গেল। রাফিয়ার আবৃত্তির শুরু এভাবে।
‘আমি যখন স্কুলে, তখন থেকেই আম্মু আমাকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পাঠাতেন। ছবি আঁকা, আবৃত্তি এসবে উৎসাহ দিতেন’, বলল রাফিয়া।
এসবে নিয়মিত অংশ নিলেও পড়াশোনায় ভাটা পড়েনি মোটেও। পিএসসি, জেএসসিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি ও এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাস আছে তার ঝুলিতে।
অষ্টম শ্রেণিতে থাকতেই স্কুলের বিতর্কে নেতৃত্ব চলে আসে তার হাতে। তার নেতৃত্বে সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবে স্কুলের হয়ে তার টিম রানারআপ হয়। সম্প্রতি ‘জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২৩’ এ রাফিয়া কলেজ ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ বিতার্কিকও হয়।
চট্টগ্রাম কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পা রাখার পর পরই রাফিয়ার মনে হলো, এতসবে মন ভরছে না। আরও কিছু করা চাই।
এরপরই মনোযোগ যায় রান্নায়। রাফিয়া বলল, ‘রান্না দিয়ে কিছু একটা করব এটা চিন্তাতেও ছিল না। ছোটবেলায় মাকে দেখতাম নানান রেসিপি তৈরি করছে। আমাদের আবার রান্নাঘরে যাওয়া ছিল বারণ। মা বলতেন, রান্না করার প্রয়োজন নেই, তোমার কাজগুলো মনোযোগ দিয়ে কর। তবে টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখে আগ্রহ বাড়তেই থাকে। সুযোগ পেলেই ঢুকে পড়তাম রান্নাঘরে। মা-ও রাগ করতেন, কী করছ হাত কেটে যাবে তো! চুলা ধরলেই যেন হাত পুড়ে যাবে। এমন ভয় ছিল মায়ের।’
‘কিন্তু আমার রান্নার আগ্রহ দেখে পরে আর না করেনি মা। টিভিতে যে রেসিপিগুলো দেখতাম সেগুলোর উপকরণ বাজার থেকে আনার জন্য তালিকা করে দিতাম। আমিও পরম উৎসাহে রান্না চালিয়ে যেতে লাগলাম। অনেক সময় এটা-সেটা পাওয়া যেত না। তখন নিজেই সেগুলো তৈরি করে নিতাম।’
আর এভাবেই তীর লিটল শেফ ২০২০ (সিজন-২)-এর আসরে সেরা হয়ে গেল রাফিয়া। এ প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সে জানতে পারে মায়ের কাছ থেকেই। মা-ও বোধহয় আঁচ করতে পেরেছিলেন, তার মেয়ে রান্নার জগতে একটা কিছু ঘটিয়ে দিতে পারবে। বড় বোনের সাহায্য নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করার পর শুরু হয় অডিশন। প্রথমে অনায়াসে দেশসেরা ৩০ খুদে শেফের মধ্যে স্থান হয় রাফিয়ার। এরপর একে একে বেশকটি ধাপ পার হয়ে শেষে বিজয়ীর মুকুট ওঠে তার মাথায়।
রাফিয়া বললেন, ‘মায়ের অনুপ্রেরণাতেই আজকের এ সাফল্য। বাবাও সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হন। তাদের হাত ধরে কর্মশালায় যেতাম। অংশ নিতাম বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়।’
প্রতিযোগিতাতে জিতেই কিন্তু থেমে নেই রাফিয়া। নিয়মিত চর্চা চলছে হরেক পদের। এর মধ্যে আছে কন্টিনেন্টাল ডিশ, বিদেশি খাবারে দেশি ফিউশন ও নিত্যনতুন ডেজার্ট। বাসার সবার পছন্দের তালিকায় আছে হানি বারবিকিউ চিকেন, স্মোকি বিফ স্টেক ও চকোলেট জিনোইস কেক।
রান্না করে খাওয়ানোর জন্য ক্যাম্পাসের বন্ধুরা আবদার করেই চলে। রাফিয়া বলল, ‘আমার কোনো সাফল্যের খবর পেলেই ট্রিট চায়। কিন্তু বড় কোনো প্রোগ্রামে রান্না করা হয়নি। আর আমি তো এখনো পড়ছি। কলেজের অনুষ্ঠানও বড় আকারে হয়, তাই আপাতত বড় পরিসরে রান্নার চিন্তাভাবনা নেই।’
ফেসবুকে ‘রাফিয়াস হাংগ্রিল্যাব’ নামে একটি পেজ রয়েছে রাফিয়ার। সেখানে সে হরেক রেসিপি, কেকের ছবি এসব শেয়ার দিচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন এ উদ্যোগ আরও বড় করা যায় কি না। রাফিয়া বলল, ‘অল্প সময় এত সাড়া পাব ভাবিনি। পড়াশোনার পাশাপাশি এটার (ফেসবুকে রান্নার বিজনেস) জন্যও কাজ করছি। তবে আপাতত পড়াশোনাই সবার আগে।’
এদিকে বিজ্ঞানের ছাত্রী রাফিয়াকে ফিজিক্সও বেশ টানে। মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকেই ইন্টারনেট ঘেঁটে শিখছে নানান কিছু। সুযোগ পেলে এ বিষয়ে করতে চায় বড় গবেষণা।
নাসা চাঁদের বুকে ফেমটোস্যাটেলাইট নামে একটি স্যাটেলাইট পাঠাবে। সেখানে পরীক্ষা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ২২টি দেশ মনোনীত হয়। বাংলাদেশও তার একটি। আর বাংলাদেশ টিমের একজন সদস্য রাফিয়া। নাসা গ্লি মিশনের অধীনে বাংলাদেশ টিমের হয়ে কাজ করছে সে। কলোরেডো স্পেস গ্রান্ট কনসোর্টিয়ামের পরিচালনায় চলছে দেদার গবেষণা।
রাফিয়া জানাল, ‘এ মিশনের সব যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য ব্যয় নাসা বহন করছে। নভোচারী হয়ে মহাকাশ যাত্রারও ইচ্ছা আছে তার। কলেজগুলোতে মহাকাশ নিয়ে তেমন কোনো পাঠ নেই। তাই যারা মহাকাশ নিয়ে কিছু করতে চায়, তাদের সুযোগটা একটু কম। নাসার কারণে আমি অবশ্য অনেক কিছু জানার একটা বড় সুযোগ পেয়েছি।’
মন্তব্য করুন