দেশে জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে; কিন্তু সে তুলনায় বাড়ছে না কর্মসংস্থান। যে কারণে দেশে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা মানুষ এবং বেকার জনগোষ্ঠীর হার বাড়ছে। আবার মোট জনসংখ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি তরুণ হলেও তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ অলস সময় কাটাচ্ছে। তাদের না আছে শিক্ষা, না আছে কাজ। দেশের সম্পদ না হয়ে উল্টো বোঝা হচ্ছে তারা। এ অবস্থায় দেশের জনসংখ্যা কবে জনসম্পদ হবে, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১৫ লাখ ৯০ হাজার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জন। সেই হিসাবে ২০২৪ সালে এসে জনসংখ্যা বেড়েছে ১৭ লাখ ৬১ হাজার ৮৯ জন। বিবিএসের হিসেবে, বর্তমানে দেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬২ শতাংশই কর্মক্ষম মানুষ। তরুণের সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে উঠে এসেছে জনশুমারি ও গৃহগণনার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৩ ভাগের ২ ভাগই তরুণ। কিন্তু সেই তরুণদের ৪০ শতাংশই অলস বসে আছে। এদিকে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উপাত্ত ব্যবহার করি, সাম্যের ভিত্তিতে সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ি’। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট তরুণের (১৫-২৪ বছর বয়সী) ৪০ শতাংশই এমন অলস ভূমিকায় রয়েছেন। সরকার তাদের চিহ্নিত করেছে, শিক্ষা, কর্ম কিংবা প্রশিক্ষণে নেই এমন তরুণ (নিট) হিসেবে। স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩-এর জরিপে দেখা যায়, কোনো কিছু করে না, দেশে এমন তরুণের হার ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ, এরা পড়াশোনা করে না, কোনো কাজও করে না। এমনকি তারা কোনো কাজের প্রশিক্ষণও নিচ্ছে না। নিষ্ক্রিয় থাকা এই জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই নারী। তরুণদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ নিষ্ক্রিয়, আর তরুণীদের মধ্যে এই হার ৬০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। জরিপের তথ্য বলছে, এই জনগোষ্ঠীর ৪১ দশমিক ৩ শতাংশই গ্রামে বাস করে। অন্যদিকে শহরের তরুণদের মধ্যে এমন অলস তরুণ জনগোষ্ঠী ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ। জনশুমারি ২০২২-এর প্রতিবেদন বলছে, এ ধরনের অলস জনগোষ্ঠী রয়েছে ১ কোটিরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাবনাময় এ তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সম্পদ না হয়ে বোঝা হচ্ছে। কর্মমুখী শিক্ষা না থাকায় তারা অলস সময় পার করছে। এদের কীভাবে উৎপাদনশীল জনসংখ্যায় রূপান্তরিত করা যায়, সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ। যুবসমাজের হার বেড়ে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এটা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির একটি কারণ হতে পারে। নিষ্ক্রিয় তরুণের হার কমাতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দেওয়া এবং ঝরে পড়াদের আবার শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা জরুরি।
বাড়ছে বেকারত্বের হার : বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে দেশে বেকার বেড়ে হয়েছে ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশে বেকার ছিল সাড়ে ২৩ লাখ। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে দেশে বেকার বেড়েছে ২ লাখ ৪০ হাজার জন। বিবিএসের হিসেবে দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে বর্তমানে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ বেকার। বিবিএস বলছে, সাত দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টাও কোনো কাজ করেনি, কিন্তু কাজের জন্য প্রস্তুত ছিলেন, তাদেরই বেকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকি জরিপের আগে ৩০ দিন বেতন বা মজুরি বা মুনাফার বিনিময়ে কাজ খুঁজেছেন, তারাও বেকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট বেকারের মধ্যে পুরুষ ১৭ লাখ ৪০ হাজার আর নারী বেকার ৮ লাখ ৫০ হাজার। তিন মাসে আগে দেশে পুরুষ বেকার ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার আর নারী বেকার ছিল ৭ লাখ ৮০ হাজার। সেই হিসেবে তিন মাসের ব্যবধানে দেশে পুরুষ বেকারে বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার আর নারী বেকার বেড়েছে ৭০ হাজার।
এদিকে, বেকারের বাইরে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে। যাদের বড় অংশই শিক্ষার্থী, অসুস্থ, অবসরপ্রাপ্ত বা বয়স্ক, কাজ করতে অক্ষম এবং কর্মে নিয়োজিত নন বা নিয়োজিত হতে অনিচ্ছুক। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রমশক্তির বাইরে রয়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার। তিন মাস আগে এই সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীর সংখ্যাই বেশি। অন্যদিকে, দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছেন। কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানোর হার দিন দিন বাড়ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রতি হাজারে ৮ দশমিক ৭৮ জন দেশ ছেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল প্রতি হাজারে ৬ দশমিক ৬১ জন। অর্থাৎ বছরের ব্যবধান বিদেশ গমন বেড়েছে হাজারে ২ জনের বেশি।
জনসংখ্যার আরেকটি গুরত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী। এই হারও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বয়স্ক বা বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা। সাধারণত মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে, তার কর্মক্ষমতা তত কমতে থাকে। সেই মানুষ অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে শুরু করে। এই হিসেবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এই বৃদ্ধির হার ঊর্ধ্বমুখী। পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবেই দেশে নির্ভরশীল মানুষের হার বাড়ছে। বর্তমানে দেশে নির্ভরশীল মানুষের হার ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৫১ দশমিক ১ শতাংশ। নির্ভরশীলদের মধ্যে বেশি বেড়েছে প্রবীণদের হার। ২০১৯ সালে দেশে প্রবীণ নির্ভরশীল মানুষের হার ছিল ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে ৯.৪ শতাংশ। ২০১৯ সালের মতো ২০২০ সালেও প্রবীণ নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ। ২০২১-২২ সালে তা বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, তারুণ্যনির্ভর জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আজকের এ বিশাল কর্মক্ষম ও উদ্যমী তরুণ জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার এখনই সময়। তাদের বাদ দিয়ে জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা আমরা নিতে পারব না। এদের কীভাবে উৎপাদনশীল জনসংখ্যায় রূপান্তরিত করতে পারি, এটিই বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এই জনগোষ্ঠীকে কর্মে নিয়োজিত করতে দক্ষতা বাড়াতে হবে। এজন্য কারিগরিসহ কর্মমুখী শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অথচ আমাদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে কথা বলা হয়েছে সেই পরিমাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এ ছাড়া বাজেটে এ খাতে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যদি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে দেশের জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত করা সম্ভব নয়। উল্টো দেশের বোঝা হবে।