১৯৭৮ সাল। জাহাঙ্গীর আলমের বয়স তখন মাত্র ১২-১৩ বছর। গ্রামে অভাব-অনটনে থাকা ছেলেটি ঢাকায় আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালেক উকিলের বাসায়। সেই বাসার টুকটাক কাজ করতেন তিনি। পরে মালেক উকিলের অনুরোধে জাহাঙ্গীরকে দলের নতুন সভাপতি শেখ হাসিনা তার বাসার কাজের জন্য রেখে দেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তাকে ব্যক্তিগত সহায়তাকারী নিয়োগ দেন শেখ হাসিনা। এর পর আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান পিয়ন জাহাঙ্গীর আলম। এখন তিনি ৪০০ কোটি টাকার মালিক। ধরপাকড়ের ভয়ে দিন দশেক আগে তিনি আমেরিকার ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে পালিয়ে গেছেন।
এলাকা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সাল থেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন জাহাঙ্গীর। শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাড়ি সুধাসদনে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের পানি খাওয়ানোর কাজ করতেন তিনি। ফলে তাদের কাছে একসময় তার নাম হয়ে যায় ‘পানি জাহাঙ্গীর’। ২০০৯ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ পদের কাজ প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফুটফরমায়েশ শোনা। কিন্তু তিনি সর্বত্র নিজেকে পরিচয় দিতেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে। এমন কোনো দপ্তর নেই, যেখানে তিনি তদবির করতেন না। এ তদবির বাণিজ্য করেই শত শত কোটি টাকার মালিক হন জাহাঙ্গীর। তার এমন অনিয়ম-দুর্নীতি ও ভুয়া ক্ষমতার অপব্যবহার জানার পর তাকে ২০১৯ সালে
চাকরিচ্যুত করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তবুও তিনি প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দিয়ে নানা অনিয়ম করতেন। বিষয়টি নজরে এলে গত বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জাহাঙ্গীরের বিষয়ে সতর্ক করা হয়। তাতে বলা হয়, তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্পর্ক নেই। সম্প্রতি দেশে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একের পর এক দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হওয়ার পর নিজেকে নিরাপদ রাখতে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আমেরিকায়। বর্তমানে তিনি দেশটির ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছেন। সেখানে তার স্ত্রী-সন্তান বসবাস করেন। তিনি আর দেশে ফিরবেন না বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ।
হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয় জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি কালবেলাকে বলেন, আমি ১৯৮৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে কেন চাকরিচ্যুত করা হয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়নি। গত নির্বাচনের আগে আমি আমার আইডি কার্ড জমা দিয়েছি। কারণ আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নির্বাচন করব। কিন্তু দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে আমি নির্বাচন করিনি। বর্তমানে ভার্জিনিয়ায় অবস্থান করছেন বলেও স্বীকার করেন তিনি।
কে এই জাহাঙ্গীর: জাহাঙ্গীর আলম নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার নাহারখিল গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা রহমত উল্যা ও মা অজিফা খাতুন। তার বাবা ইউনিয়ন পরিষদে কেরানি পদে চাকরি করতেন। সংসারে ছিল টানাপোড়ন। আশির দশকে সাবেক আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল মালেক উকিলের বাসায় কাজ নেন জাহাঙ্গীর। নিজ জেলা ও দরিদ্র পরিবার বিবেচনা করে তাকে বাসায় রাখেন মালেক উকিল। পরে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তখন বিদায়ী সভাপতি মালেক উকিলের অনুরোধে জাহাঙ্গীরকে নিজের বাসায় গৃহকর্মে নিয়োজিত করেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার ধানমন্ডির বাড়ি সুধাসদনে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের পানি খাওয়ানোর কাজ করতেন তিনি। তখন থেকে ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামে তিনি পরিচিত। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আহতও হয়েছিলেন তিনি।
২০০৯ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পিএ হন। তারপর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রভাব দেখিয়ে এবং নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয় দিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি করে ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে যান। শুধু তাই নয়, নিজ এলাকা চাটখিলে যেতেন হেলিকপ্টারে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রভাব খাটিয়ে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতিও হন তিনি। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে দান করতেন অকাতরে। নোয়াখালী-১ আসন থেকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। এবার স্বতন্ত্র নির্বাচন করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
এলাকাবাসী জানান, একসময় তাদের পরিবার ছিল খুবই দরিদ্র। বর্তমানে জাহাঙ্গীর আলম অঢেল সম্পদ ও টাকার মালিক। সবই হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে। গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাহাঙ্গীর আলমের সম্পদশালী হয়ে ওঠার কথা জানান। তিনি বলেন, আমার বাসায় কাজ করে গেছে পিয়ন, সে এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক। হেলিকপ্টার ছাড়া চলে না। এটা বাস্তব কথা। কী করে বানাল এই টাকা। যখন আমি জানছি, তাকে বাদ দিয়ে কার্ড সিজ করে ব্যবস্থা নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, ধরার পর এগুলো চোখে আসে। তা ছাড়া তো হয় না। যখনই ধরা পড়ে তখনই আমরা ব্যবস্থা নিই। এটা এক ধরনের মানসিকতা।
৪০০ কোটি টাকা প্রসঙ্গে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তো আমার নাম বলেননি। আমি ও আমার চৌদ্দগোষ্ঠীও ৪০০ কোটি টাকার মালিক নই। আপনি আমার আয়কর বিবরণী দেখলেই জানতে পারবেন।
নোয়াখালীতে বিলাসবহুল দুই বাড়ি: আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাহাঙ্গীর আলমের উত্থান হয় আলাদীনের চেরাগের মতো। চাটখিলে পৈতৃক ভিটায় করেছেন চারতলা বাড়ি। আর তার দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে নোয়াখালীর মাইজদী শহরের হরিনারায়ণপুরে বানিয়েছেন বিলাসবহুল ৮ তলা বাড়ি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মাইজদীর বাড়িটা আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর জমিতে ঋণ করে বানিয়েছি। সেখানে আমার নামেও জমি আছে। জমিটি খালি পড়ে আছে। বাড়ি বানাতে পারিনি।
জাহাঙ্গীরের প্রভাবে স্বজনরা জনপ্রতিনিধি: নিজের প্রভাব খাটিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার পরিবারের একাধিক সদস্যকে। জাহাঙ্গীরের ভাই দীর্ঘদিন ধরে চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তার ভাগ্নে মাসুদুর রহমান শিপন জেলা পরিষদের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান। দুটি পদই জাহাঙ্গীর আলমের ক্ষমতার জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। জাহাঙ্গীরের দাপটে তাদের বিরুদ্ধে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে সাহস পাননি। ভাগ্নে শিপনও মামার জোরে আধিপত্য দেখিয়ে যাচ্ছেন।
জাহাঙ্গীর এলাকায় গিয়ে পুলিশ প্রটোকলে চলাফেরা করতেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে তুলে ধরতেন। তিনি বিভিন্ন সময় দেওয়া তার বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোথায় যেতেন, কী করতেন, প্রধানমন্ত্রী কোন সময় কী করতেন, তা তুলে ধরতেন।
ব্যাংক হিসাব জব্দ: জাহাঙ্গীর আলম, তার স্ত্রী কামরুন নাহার ও তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। তাদের হিসাব খোলার ফরমসহ যাবতীয় তথ্য পাঁচ দিনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছে। গত রোববার সব ব্যাংকে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা পাঠানো হয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ব্যাংক/আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো হিসাব থাকলে সেসব হিসাবের লেনদেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২৩ (১) (গ) ধারার আওতায় ৩০ দিনের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হলো।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছে নোয়াখালী ব্যুরো ও চাটখিল প্রতিনিধি)