

কান্নার ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছেন ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া চৌরঙ্গী মোড় এলাকার বাসিন্দা আসাদুজ্জামান। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না বিষয়টি সত্য। মনে মনে বারবার বলেছেন, সংবাদটি যেন মিথ্যা হয়। কিন্তু পরক্ষণেই সবকিছু ওলটপালট করে দেয় তাকে। তার ছেলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
আসাদুজ্জামান ও রহিমা খাতুন দম্পতির বড় সন্তান রেদুয়ান হোসেন সাগর। উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তিনি জেলার ফুলবাড়িয়া ডিগ্রি কলেজে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষে পড়ছিলেন। তার ছোট বোন আফিয়া তাবাসসুম আনন্দ মোহন কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। নিহত সাগরের মা রহিমা খাতুন আট বছর ধরে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। গত ১৯ জুলাই বিকেলে নগরীর মিন্টু কলেজ সড়ক এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন সাগর। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হলে সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
গতকাল শুক্রবার চৌরঙ্গী মোড়ে গিয়ে কথা হয় নিহত সাগরের বাবা আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। ছেলের মৃত্যুর শোকে পাথর তিনি। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘গত বুধবার (১৭ জুলাই) সেলুনে গিয়ে সাগর চুলি-দাঁড়ি কাটে। চুল-দাঁড়ি কাটার পর ছেলেটাকে বেশ ভালোই লাগছিল। শুক্রবার (১৯ জুলাই) বিকেলে ছেলে বাসা থেকে বের হয় হাসপাতালে কাউকে ডাক্তার দেখাবে বলে। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাসায় না ফেরায় তাকে ফোন দিই। কিন্তু সে ফোন রিসিভ করছিল না। হঠাৎ তার মোবাইল ফোন থেকে অপরিচিত একজন কল করে জানায় সাগর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আছে। তাৎক্ষণিক আমার ছোট ভাই আকরামুজ্জামান হাসপাতালে ছুটে যায়। গিয়ে দেখে সাগর আর নেই। তার বুকের বাঁ এবং ডান পাশে গুলি লেগেছে।’ তিনি বলেন, ‘ওইদিন রাত ৮টার দিকে কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ বাসায় পৌঁছে দেয়। পরদিন সকাল ১০টায় জানাজা শেষে মাদ্রাসা কোয়ার্টার কবরস্থানে দাফন করা হয় সাগরকে।’
পেশায় ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমার ছেলেটা অত্যন্ত নম্র-ভদ্র ছিল। কোনোদিন কারও সঙ্গে বেয়াদবি করেনি। কারও দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। তার এমন মৃত্যুতে কষ্ট আছে, দুঃখ করি না। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। আমার ছেলের মৃত্যুর বিচার চাই না। আল্লাহ তার মৃত্যু এইভাবে লিখে ছিলেন তাই তার মৃত্যু হয়েছে। আমি চাই দেশটা শান্তিতে থাকুক।’ তিনি আরও বলেন, পুলিশের সদস্যরা আমাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন, তারা বলেছে কোনো অভিযোগ থাকলে করার জন্য। কিন্তু আমরা কোনো অভিযোগ করতে চাই না। তবে যে আন্দোলনে আমার নিষ্পাপ ছেলেটা প্রাণ দিয়েছে, তা যেন সফল হয়। আর কোনো আন্দোলনে কারও বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না হয়।’
নিহত সাগরের চাচা মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘সাগর কথা বলা শেখার পর থেকেই আমাকে বাবা বলে ডাকত। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আমার কাছেই আবদার করত। আমি তাকে সন্তানের মতো মানুষ করেছি। কারণ সে আমাদের বংশের বড় সন্তান।’ এসব কথা বলার সময় তার চোখের পানি টলমল করছিল। তিনি বলেন, ‘সাগর হিসাব বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেও আইটিতে তার খুব দক্ষতা ছিল। সবসময় ব্যতিক্রম কিছু করার চেষ্টা করত। ছেলেটা আমাদের এভাবে ছেড়ে চলে যাবে বুঝতে পারিনি।’
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা (ওসি) মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাগর নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। তবে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ না করলেও বিষয়টি পুলিশ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।