বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অব্যাহত হামলা-মামলা ও ধরপাকড়ের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে পাশে চায় বিএনপি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা এ দলটির দাবি, বিগত দুটি সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০১৪ সালে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ভোট বর্জন করেছে আর ২০১৮ সালে দিনের ভোট রাতে হয়েছে। এ বিষয়টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর কাছেও স্পষ্ট। তাই বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে তাদের ভূমিকা পালনের সুযোগ আছে। দলটির প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
দাবি আদায়ে বিএনপি নেতারা মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি কূটনীতিকপাড়ায়ও কয়েক মাস ধরে দৌড়ঝাঁপ করছে। বিশেষ করে ১২ জুলাই সরকার হটানোর একদফার আন্দোলন শুরুর পর থেকে এই তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। এদিকে আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের তৎপরতাও লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশে আগামীতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে গত মে মাসে ভিসা নীতি ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় পশ্চিমা এই দেশটি। এ ছাড়া বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের হামলা-মামলা ও দমন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জোরালো ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশপথে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে পুলিশ ও সরকারি দলের হামলার ঘটনায় জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কড়া বিবৃতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে দলটি। সেখানে বাংলাদেশে বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। পশ্চিমা দেশ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার এই অবস্থানকে সরকারবিরোধী চলমান আন্দোলনের জন্য সহায়ক বলেও মনে করছে বিএনপি। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মার্কিন এই ভূমিকা আগামীতে আরও জোরালো হবে বলে প্রত্যাশা দলটির।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমেরিকান মানুষ, বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার সংস্থা এখন তাদের সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে বলছে যে, বাংলাদেশের ওপর একটা শুনানি হোক। একটা লং ড্রাইভ কমিশন আছে। সেখানে বলেছে যে, বাংলাদেশে এখন বিরোধী দলগুলোর ওপর অত্যাচার-নির্যাতন হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে এই সরকার বাধা দিচ্ছে। তাই এদের আবার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হোক।
এদিকে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ভারতকেও পাশে চায় বিএনপি। দলটি মনে করছে, পার্শ্ববর্তী দেশে যে গণতন্ত্রহীনতা বিরাজ করছে, ভারত সে সম্পর্কে অবগত। ফলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভারতের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিএনপির প্রত্যাশা, ভারতও এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
যদিও বাংলাদেশ সফরকালে ২০১৩ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল এবং ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র আটকসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দেশটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় বিএনপির। এ দূরত্ব কমাতে কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছে দলটি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশটির দায়িত্বশীলদের কাছে এই দুই ইস্যুতে বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতবিরোধী কোনো তৎপরতা চালাতে দেওয়া হবে না বলেও দেশটিকে বারবার আশ্বস্ত করেছে দলটি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গও ছেড়েছে বিএনপি, সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন শুরুর আগে ভেঙে দেওয়া হয় ২০ দলীয় জোট। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের এই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হলে তা ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র কারও জন্যই সুখকর হবে না বলে মনে করছে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি একাধিক স্তরের বৈঠকে মার্কিন প্রশাসনকে ভারতের পক্ষ থেকে এমন বার্তাই দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পত্রিকাটি। এমনকি বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের নানা পদক্ষেপে ভারত যে খুশি নয়, সেটিও তাদের জানানো হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে মনে করছে বিএনপি। দলটি মনে করে, ভারতও বাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। তারা বিশেষ কোনো দলের পক্ষে না, বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে। প্রতিবেশী দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক-তাদের এই অবস্থানই অটুট আছে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য শামা ওবায়েদ কালবেলাকে বলেন, এই সরকারের পায়ের নিচে মাটি একেবারেই নেই। টিকে থাকার জন্য আনন্দবাজার পত্রিকায় তারা একটি খবর ছাপিয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা খোঁজখবর নিয়েছি, দুই দেশের সঙ্গেই কথা হয়েছে। আমরা দায়িত্ব নিয়েই বলছি, এটি একটি ডাহা মিথ্যা সংবাদ। এই সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আর কিছু না পেরে এখন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতা ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে প্রত্যাশা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিদেশিদের সঙ্গে বিএনপির নতুন করে কোনো যোগাযোগ হচ্ছে না। আগে যেভাবে যোগাযোগ হয়েছে, এখনো সেভাবেই হচ্ছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। তা ছাড়া কূটনীতি রাজনীতির একটা অংশও। বিদেশিরা এখন বিএনপির সঙ্গে দুবার কথা বললে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দশবার কথা বলছে। কারণ, দেশবাসীর মতো তারাও আগামীতে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন চায়। এ ব্যাপারে বিদেশিদের অবস্থান স্পষ্ট। এটা বিএনপিরও ঘোষিত অবস্থান। বিদেশিরা এ বিষয়টিই সরকারকে বারবার করে বলছে।
মন্তব্য করুন