দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় রাজনীতিতে নানামুখী তৎপরতা চলছে। ভোটের তপশিল ঘোষণার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অনড় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে লাগাতার আন্দোলন করছে বিএনপিসহ প্রায় ৪০টি রাজনৈতিক দল। আন্দোলন কেন্দ্র করে মামলা ও গ্রেপ্তারে বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রায় কোণঠাসা। তা সত্ত্বেও দলটি একদফা আদায় না করে নির্বাচনে না যাওয়ার প্রশ্নে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়।
নির্বাচন নিয়ে প্রধান দুই দলের বিপরীতমুখী এই অবস্থানের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। ধর্মভিত্তিক দল দুটির সাম্প্রতিক তৎপরতা ও তাদের প্রতি সরকারের আচরণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, চলমান পরিস্থিতিতে যেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা নানাভাবে পর্যুদস্ত, সেখানে জামায়াতে ইসলামী গত ২৮ অক্টোবর পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শান্তিপূর্ণভাবে কীভাবে ঢাকায় এত বড় মহাসমাবেশ করল? দলটির আমির, সেক্রেটারি জেনারেলসহ কয়েকজন নেতা আগে থেকেই কারাগারে থাকলেও সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য কোনো নেতা গ্রেপ্তার হননি। তিন ক্যাটাগরিতে শতাধিক আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী চূড়ান্ত করাকে জামায়াতের নির্বাচনে যাওয়ার ইঙ্গিত বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গত ৩ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ করেছে। সেখানে সারা দেশের নেতাকর্মীরা নির্বিঘ্নে জড়ো হয়েছিলেন। সেখান থেকে ১০ নভেম্বরের মধ্যে সরকারকে পদত্যাগ করার সময় বেঁধে (আলটিমেটাম) দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত দলটির কোনো নেতাকর্মীকে মামলা বা গ্রেপ্তারের শিকার হতে হয়নি। সভা-সমাবেশে সরকারের সমালোচনা করলেও ইসলামী আন্দোলন কঠোর কোনো কর্মসূচি দেয়নি। এসব কারণে অনেকেই সন্দেহ করছে, সরকারের সঙ্গে তাদের গোপনে কোনো বোঝাপড়া হয়ে থাকতে পারে।
তবে দুই দলের নেতাদের দাবি, কোনো সংঘাতে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমেই তারা দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন। সরকার দাবি মানতে বাধ্য হবে বলেও তারা আশাবাদী।
জামায়াতের অবস্থান কী?
রাজনৈতিক উত্তেজনা ও টানাপোড়েনের মধ্যে দীর্ঘ এক দশক পর গত ১০ জুন রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রকাশ্যে সমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। এর পরই রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনায় আসে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদদের অনেকেই সে সময় বলেছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে সরকারের কোনো বোঝাপড়া হয়েছে। তা না হলে তাদের প্রকাশ্যে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার কথা নয়। অবশ্য জামায়াতের নেতারা তখন বলেছিলেন, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতি তাদের জন্য অনেকটা ইতিবাচক হয়েছে। যে কারণে পুলিশ ও প্রশাসন চাপে পড়ে তাদের সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তবে ১০ জুনের পর আর প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচির অনুমতি পায়নি জামায়াত। গত ১ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশ করার ঘোষণা দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সায় না থাকায় তা করতে পারেনি দলটি। এরপর জামায়াতে ইসলামী বিভাগীয় সমাবেশ করতে গেলে কোথাও অনুমতি পায়নি। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের বাধার সম্মুখীন হয়েছে দলটি। বরং সারা দেশে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা ও গ্রেপ্তারের মাত্রা বেড়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক মুহাম্মদ আতাউর রহমান সরকার জানান, ৮ নভেম্বর বিকেল ৪টা থেকে ৯ নভেম্বর দুপুর ১টা পর্যন্ত সারা দেশে জামায়াতের নেতাকর্মী আটক হন ৬৪ জন। ২৫ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত সর্বমোট গ্রেপ্তার হন ১ হাজার ৯৩৬ জন।
এরই মধ্যে গত ২৮ অক্টোবর দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছিল জামায়াত। তবে সেই সমাবেশের অনুমতি দেয়নি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, জামায়াত অনুমতি ছাড়া সমাবেশ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে অনুমতি না পেলেও ওইদিন শাপলা চত্বরে সমবেত হয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামীর বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে পুলিশের কাঁটাতারের ব্যারিকেড সরিয়ে আরামবাগে সমাবেশ করে দলটি। একই দিন বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও নির্বিঘ্নে সমাবেশ শেষ করে শাহজাহানপুর-কমলাপুর দিয়ে চলে যান জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এ কারণে সরকারের সঙ্গে দলটির নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো বোঝাপড়া হয়েছে কি না—সেই প্রশ্ন দেখা দেয়।
তবে এ ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম কালবেলাকে বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে যে ধরনের কর্মসূচি প্রয়োজন আমরা তা পালন করছি। আগামীতেও কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হলে সে বিষয়ে আমরা জানাব।’
হুংকারে গরম, কর্মসূচিতে নরম ইসলামী আন্দোলন : এদিকে সভা-সমাবেশে সরকারের প্রতি হুংকার দিলেও রাজপথে সে রকম কোনো অবস্থান দেখা যাচ্ছে না ইসলামী আন্দোলনের। নির্দিষ্ট কিছু দাবিতে মাঝে মধ্যে কর্মসূচি দিলেও নির্বাচন নিয়ে তাদের খুব বেশি কঠোর বার্তা নেই। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে দলটি। পুলিশের অনুমতি নিয়েই গত ৩ নভেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করেছে ইসলামী আন্দোলন। সেখানে সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা জমায়েত হয়েছিলেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপিসহ আন্দোলনরত দলগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন নির্বিঘ্নে বড় সমাবেশ করেছে। সেখান থেকে সরকারকে আলটিমেটামও দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের একজন নেতাকর্মীও গ্রেপ্তার হননি। কারও নামে মামলাও হয়নি। ফলে নির্বাচনের আগে দলটির অবস্থান নিয়ে কেউ সন্দেহ করলে তা অমূলক হবে না।
যদিও গত বুধবার ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম দলের মজলিসে আমেলার সভায় একগুঁয়েমি পরিহার করে সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘দেশকে সংঘাতের মধ্যে ফেলে একতরফা নির্বাচনের আয়োজন সরকারের জন্য বুমেরাং হবে।’
তিনি নির্বাচন কমিশনকে একতরফা নির্বাচনের পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সংসদ ভেঙে দিয়ে জাতীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিলেরও দাবি জানান।
জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন গতকাল বৃহস্পতিবার কালবেলাকে বলেন, ‘আমাদের কথা পরিষ্কার যে, জাতীয় সরকার বা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া আমরা বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবো না। নির্বাচনের পরিবেশ কেমন আছে সেটি সিইসি বলুক আর কেউ বলুক তাতে কিছু যায় আসে না। নির্বাচন নিয়ে আমরা সরকারের মুখ থেকে বক্তব্য শুনতে চাই।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সমাবেশ নির্বিঘ্ন হয়েছে বলেই কী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের কথা উঠছে? আমাদের মহাসমাবেশ যে নির্বিঘ্নে হয়েছে তা বলার সুযোগ নেই। অনেক জায়গা থেকে বাস আসতে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ফেরত পাঠিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও তো শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে। তাহলে কী সরকারের সঙ্গে তাদের আঁতাত হয়েছে? বিএনপিও তো অনুমতি পেয়ে সমাবেশ করেছে। তাহলে কি বলবেন?’
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ভেতরে-বাইরে দুই জায়গায় আছি। এটি সব রাজনৈতিক দলের থাকে। সুতরাং নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি আলাদা নিতে হবে এমন কোনো বিষয় নয়।’