মো. আমানুল্লাহ আমান, ক্ষেতলাল (জয়পুরহাট)
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩৯ এএম
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ক্ষেতলালে অধ্যক্ষের ‘ব্যাকডেট’ নিয়োগ বাণিজ্য

খোশবদন জি. ইউ আলিম মাদ্রাসা
ক্ষেতলালে অধ্যক্ষের ‘ব্যাকডেট’ নিয়োগ বাণিজ্য

২০২২ সালের ৬ জুলাই ২ হাজার ৭১৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করেছিল সরকার। এরই একটি জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার খোশবদন জি. ইউ আলিম মাদ্রাসা। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আলিম শাখায় শুরু থেকে যারা শিক্ষক-কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, এমপিওভুক্ত হওয়ার পর তাদের একটি অংশকে বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এরপর পেছনের তারিখ দিয়ে কৌশলে কয়েকজন শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. একরামুল হক। নিয়োগ দিয়ে একেকজন শিক্ষকের কাছ থেকে ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ রয়েছে, এমপিওভুক্ত হওয়ার পর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নিয়োগ বাণিজ্য করে হাতিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। অধ্যক্ষ তার মনোনীত সহযোগীদের নিয়ে এমপিওভুক্ত হওয়ার পর আলিম শাখায় শুরু থেকে চাকরিতে থাকা নিয়মিত তিনজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেছেন। মোটা অঙ্কের টাকা দিতে না পারায় এসব শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করে তাদের স্থলে নতুনদের নিয়োগ দিয়েছেন। শুধু তিনটি প্রভাষক পদের নিয়োগে একেকজনের কাছ থেকে নিয়েছেন ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা।

যাদের অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তারা হলেন অজিফা খান, মো. সোহেল রানা ও মো. আনোয়ার হোসেন। তাদের মধ্যে মানবিক বিভাগের (পৌরনীতি) প্রভাষক অজিফা খান মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ আটটি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) ঘেঁটে দেখা যায়, ক্ষেতলাল খোশবদন জি. ইউ আলিম মাদ্রাসার ব্যানবেইসে ২০১৬ সালের তথ্যে মো. সানোয়ার হোসেন, রুহুল আনোয়ার, আনোয়ার হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনসহ চারজনকে ২০১৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রভাষক পদে নিয়োগ দেখানো হয়। ২০১৭ সালের তথ্যে একই তারিখে সোহেল রানা নামে আরও একজন শিক্ষককে নিয়োগ দেখানো হয়। তারপর ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই পাঁচজন শিক্ষকের একই তথ্য পাওয়া যায়।

২০১৯ সালের তথ্যে হঠাৎই উদয় হন রাবেয়া খাতুন নামে আরেক শিক্ষক (সহকারী শিক্ষক, ইংরেজি পদে), যার নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালের ৩১ অক্টোবর। জন্মতারিখ দেখানো হয় ১০ অক্টোবর, ১৯৮৬। ২০২১ সাল পর্যন্ত রাবেয়া খাতুনের তথ্যও একই থাকে। ২০২১ সালে এসে প্রভাষক আনোয়ার হোসেনকে ইংরেজি, সানোয়ার হোসেনকে বিজ্ঞান, মো. সোহেল রানাকে বিজ্ঞান, মো. দেলোয়ার হোসেনকে বিজ্ঞান এবং রুহুল আনোয়ারকে মানবিক বিভাগের সহকারী প্রভাষক পদে দেখানো হয়। ২০২২ সালে তথ্যে ব্যাপক রদবদল হয়। সেখানে দেখা যায়, মানবিক বিভাগের সহকারী প্রভাষক রুহুল আনোয়ার, বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সানোয়ার হোসেন ও ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দেলোয়ার হোসেনের নিয়োগ দেখানো হয় ২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর। এ ছাড়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. সোহেল রানা ও ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আনোয়ার হোসেনকে বাদ দিয়ে সেখানে আবু নাছের আকন্দ ও রাবেয়া খাতুনের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

অবাক বিষয় হলো, ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক রাবেয়া খাতুনের নাম দুবার দেখানো হয়েছে। একটাতে দেখানো হয় সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি), জন্মতারিখ ১০ অক্টোবর, ১৯৮৬। আরেকটিতে দেখানো হয়েছে প্রভাষক (ইংরেজি), জন্মতারিখ ৯ অক্টোবর, ১৯৮৬।

২০২৩ সালের তথ্যে এসব শিক্ষকের যোগদানের তারিখ ২৬ ডিসেম্বর থেকে আবারও ২৭ ডিসেম্বর দেখানো হয়। আগের তথ্যে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক দেখানো রাবেয়া খাতুনের নাম বাদ দিয়ে সেখানে মাহফুজুর রহমান নামের আরেকজনের নাম দেখানো হয়।

মো. মাহফুজুর রহমান আগে কর্মরত ছিলেন উপজেলার মিনিগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০১৫ সালের আগের নিয়োগ ও ১১-১২ নিবন্ধন ব্যাকডেটে তার যোগদানের সময় বয়স দেখানো হয়েছে। তিনি ২০১৭ সাল থেকে (৫ নভেম্বর) ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। ওই মামলায় এই শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি গত তিন মাস ধরে ক্ষেতলাল খোশবদন আলিম শাখায় ইংরেজি প্রভাষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন। অথচ মাদ্রাসা স্কুল-কলেজের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ অনুযায়ী, চাকরিপ্রার্থীরা প্রতিষ্ঠান চাহিদামাফিক এনটিআরসির গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

চাকরিচ্যুত আরেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মাদ্রাসার অধ্যক্ষ একরামুল হকের চাহিদা অনুযায়ী মোটা অঙ্কের টাকা দিতে না পারায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।’

মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ওই প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে পরিশ্রম করেছি। এমপিও হওয়ার পর প্রিন্সিপাল আমার সঙ্গে অমানুষিক আচরণ করেন। এখন পর্যন্ত আমি কোনো রিজাইন লেটার দিইনি। ব্যানবেইসেও আমার নাম আছে। ২০২৩ সালে এনটিআরসির গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই বছরের ১ জানুয়ারি বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানে আমার ইন্ডেক্স হয়েছে। আমার স্থলাভিষিক্ত ইংরেজি প্রভাষক পদে একমাত্র এনটিআরসি নিয়োগ দিতে পারে। প্রিন্সিপাল ব্যাকডেটেড কাউকে নিয়োগ দিয়ে থাকলে এটি তদন্ত করা উচিত।’

অজিফা খান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১৩ বছর দুধের বাচ্চাকে নিয়ে চাকরি করেছি। আমাকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। শেষ পর্যন্ত আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’

ক্ষেতলাল খোশবদন জি. ইউ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. একরামুল হকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার প্রতিষ্ঠানে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনেও একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য না দিয়ে দেখা করবেন বলে ফোন কেটে দেন।

অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম মোরশেদ বলেন, ‘সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। আমি যতদূর জানি ২০২১-এর পরিপত্র অনুযায়ী এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে থাকে। সাবেক সভাপতির মৃত্যুর পর কৌশলে ব্যাকডেটে এসব শিক্ষককে নিয়োগ দিয়েছেন বলে আমার কাছেও একটা অভিযোগ এসেছে। আর আমি নিয়োগসংক্রান্ত বিষয়ে কিছুই জানি না। অধ্যক্ষ একরামুল হক কীভাবে এসব করেছেন তিনি তার জবাব দেবেন। আমি এসবের মধ্যে নেই।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পাকিস্তানকে পেয়ে এভাবেই প্রতিশোধ নিল বাংলাদেশ!

চাঁদপুর-৪ আসনে নির্বাচনী সমন্বয়ক যুবদলের তারেকুর

বর্ণাঢ্য আয়োজনে ইডেনে ‘বাণী অর্চনা’ অনুষ্ঠিত

শুক্রবার স্বর্ণের দামে নতুন রেকর্ড

আবুধাবিতে রাশিয়া-ইউক্রেন-যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আজ

নিউজিল্যান্ডে দুই কিশোরসহ ছয়জন নিখোঁজ

সুপার সিক্সের সমীকরণের ম্যাচে বোলিংয়ে বাংলাদেশ

রাঙামাটিতে ট্রাক-সিএনজির সংঘর্ষে নিহত ১

ঢাকা-৪ আসনে দ্বিতীয় দিনের প্রচারণায় রবিন

নারীর ভিডিও ধারণের অভিযোগে সালিশে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

১০

স্বাস্থ্য, ত্বক ও ঘরের যত্নে ছোট্ট জাদু ‘আদা’

১১

দুঃখ প্রকাশ

১২

অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করুন ৬ উপায়ে

১৩

ইরানের ওপর ‘কড়া নজর’ রাখছে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

১৪

শহীদ সৈকতের বাড়ি থেকে প্রচারণার দ্বিতীয় দিন শুরু ববি হাজ্জাজের

১৫

ধর্মের অপব্যবহার ও ষড়যন্ত্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান আমিনুল হকের

১৬

হেলিকপ্টারে চড়ে বিপিএলের ট্রফি নামাবেন আকবর-সালমা

১৭

শীত শেষ না হতেই সবজির বাজারে উত্তাপ

১৮

দুপুরে খাবার পরে ঘুম পায়? কোনো রোগ নয় তো

১৯

২ দিন গ্যাসের চাপ কম থাকবে যেসব এলাকায় 

২০
X