উচ্চশিক্ষার ক্রমাগত অধঃপতিত মান এবং কর্মসংস্থানের অভাবে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কোনো বিচারেই এ পরিস্থিতি ইতিবাচক নয়।
সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘উচ্চশিক্ষায় বৈশ্বিক মান: বাংলাদেশের করণীয়’ শীর্ষক সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় উঠে আসে এ বিষয়ক নানা দিক। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় উপযুক্ত মানবসম্পদ গড়ে তোলা যাচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার পরিবেশ, বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ক্রমাগতভাবে অধঃপতিত হয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক দলীয় রাজনীতি, ছাত্ররাজনীতির নামে দখলদারিত্ব এবং দুর্বৃত্তায়ন অন্যতম। ফলে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার চেয়ে রাজনীতি বেশি স্থান পায়। এ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির কারণে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পঙ্গু হওয়ার পথে। প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে মাত্র ১ লাখ শিক্ষার্থীর। অন্যদিকে দেশি ইন্ডাস্ট্রি কিংবা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না কর্মদক্ষ গ্র্যাজুয়েট। ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আনতে হচ্ছে বিদেশি দক্ষ লোক। এটি নিঃসন্দেহে দুঃখজনক চিত্র। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়েও এ চিত্রের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি বা বদলের ধারেকাছেও আমরা যেতে পারিনি।
সম্মেলনে বক্তাদের ভাষ্যে উঠে এসেছে কিছু করণীয়। তাদের ভাষ্যে, উচ্চশিক্ষার মানকে বৈশ্বিক মানে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে নেই কোনো শর্টকাট পথ। এ ক্ষেত্রে বিদেশের ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ কার্যক্রম শুরুসহ, বাইরের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষক, গবেষকদের ভিজিটিং হিসেবে আনা যেতে পারে। ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনকে সংস্কারের মাধ্যমে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও উন্নয়নে বাজেটের বরাদ্দে থাকতে হবে সুপরিকল্পনা ও সুদূরপ্রসারী চিন্তা। বৈশ্বিক মার্কেটের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাকে আরও আধুনিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় আনতে হবে যথোপযুক্ত পরিবর্তন।
উচ্চশিক্ষায় বেকারত্বের চিত্র ভয়ংকর পর্যায়ের। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, তখন দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৮২ হাজার। তাদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন প্রায় ৮ লাখ। অর্থাৎ, মোট বেকারের প্রায় ৩১ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। দেশের মোট বেকারের প্রতি তিনজনের একজন বিএ বা এমএ পাস করেও চাকরি পাচ্ছেন না। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পাস বেকার তরুণ-তরুণীদের সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় আরও খারাপ চিত্র। অর্থাৎ মোট বেকারের ৫১ শতাংশই কমপক্ষে উচ্চমাধ্যমিক পাস।
আমরা মনে করি, দেশের উচ্চশিক্ষার মান ও কর্মসংস্থানের এই চিত্র অত্যন্ত শোচনীয় এবং হতাশার। যে কোনো উপায়ে এই পরিস্থিতির বদল দরকার। এ জন্য উচ্চশিক্ষাসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায়ই যা যা সংস্কার প্রয়োজন, তা-ই করতে হবে। কেননা একদিকে প্রতি বছর শিক্ষা সম্পন্ন করে বের হচ্ছে বিরাট একটি সংখ্যা এবং তাদের জন্য দেশে নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। অন্যদিকে, শিক্ষাক্ষেত্রের দুর্বলতায় অধিকাংশই রয়ে যাচ্ছে কর্মক্ষেত্রের জন্য অদক্ষ ও অনুপযুক্ত। বেকারত্বের এই অবস্থার সমাজে যে নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং, দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী করে তুলতে আমূল পরিবর্তনের বিকল্প নেই। আমরা চাই, শিক্ষার মানোন্নয়ন ঘটুক। উচ্চশিক্ষায় দলবাজি নয়, মেধাচর্চার আদর্শ জায়গায় পরিণত হোক। চাকরির বাজারের দক্ষ জনশক্তির পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা অনুপাতে সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠুক কর্মসংস্থান।