আবু তাহের খান
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৩ এএম
আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:২২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

রাজস্ব বাড়াতে ধনীদের ওপর আয়কর বসান

রাজস্ব বাড়াতে ধনীদের ওপর আয়কর বসান

সম্প্রতি শতাধিক পণ্যের ওপর বর্ধিত হারে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বসিয়ে সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো পণ্যের ওপর থেকে কর্তৃপক্ষ ভ্যাট প্রত্যাহার এবং কোনো কোনো পণ্যের ওপর থেকে তা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে এটি প্রায় সবার কাছেই স্পষ্ট যে, ব্যাপক রাজস্ব ঘাটতির মুখে অনেকটা নিরুপায় হয়েই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারকে এমনটি করতে হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বাড়তি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ভ্যাট বৃদ্ধি ছাড়া সরকারের হাতে কি আর কোনো হাতিয়ার বা কৌশল নেই? যদি থেকে থাকে, তাহলে সরকার সেদিকে না হেঁটে এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী ও একই সঙ্গে অজনপ্রিয় ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে কেন? অনেকের মতে, সরকারকে এটি অনেকটাই আইএমএফের চাপে পড়ে করতে হচ্ছে। কিন্তু আইএমএফ তো দেশের করব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও গতিশীল করার জন্যও চাপ দিচ্ছে। তাহলে সেটি হচ্ছে না কেন?

ভ্যাট বা এ ধরনের পরোক্ষ কর বৃদ্ধির উদ্যোগ সরকার কেন নিচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতে হলে এ নিয়ে শুধু বর্তমান সরকারের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না—এ ক্ষেত্রে স্বাধীনতার একেবারে গোড়া থেকে চলে আসা দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রবণতা নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। আর মনে রাখা দরকার যে, ভ্যাট বৃদ্ধির ন্যায় সিদ্ধান্তগুলো বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত কতিপয় নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হলেও এগুলোকে কোনোভাবেই শুধু কতিপয় নির্বাহী সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করাটা সমীচীন হবে না। বরং এগুলোর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদের ওপর শাসকশ্রেণি ও তাদের অনুগত সুবিধাভোগীদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আকাঙ্ক্ষা। আর এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তারা এমনই এক স্থায়ী বোঝাপড়া ও সমঝোতায় পৌঁছেছে যে, এটিই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রায় স্থায়ী এক শাসন-কৌশল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপরিচালন ব্যবস্থায় যেহেতু সহসাই কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটার আভাস মিলছে না, সেহেতু ধারণা করা যায়, নিকট ভবিষ্যতের নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের আমলেও এ ধরনের ‘বোঝাপড়া ও সমঝোতা’ কৌশলই অব্যাহত থাকবে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ বস্তুতই রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থায় দেশের সাধারণ জনগণের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্রের রাজস্ব ব্যবস্থাকেও সে অনুযায়ী সাজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সরকারের ঊর্ধ্বতন ও পার্শ্বজনদের মধ্যকার অধিকাংশরাই তার সে উদ্যোগকে সহযোগিতা তো করেনইনি, বরং তার সে উদ্যোগকে তারা তাদের প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গণ্য করেছিলেন। আর তারই ফলে একপর্যায়ে (১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর) তাকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকেও সরে যেতে হয় এবং দলে থাকা সত্ত্বেও ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন ও ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সরাসরি যুক্ত থাকার সুযোগ পাননি। ধারণা করা হয় যে, শেষোক্ত ওই সুযোগ দুটি পেলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজস্বকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা হয়তো গোড়াতেই অন্যরকমভাবে যাত্রা করতে পারত, যেখানে নানা আঙ্গিকের পরোক্ষ করের বোঝা কখনোই জনগণের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠত না। আর তেমনটি হলে এর কিছু না কিছু ইতিবাচক রেষ ও প্রভাব ধারাবাহিকভাবে দেশের পরবর্তী বাজেটগুলোর ওপরও গিয়ে পড়ত। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, তেমনটি না ঘটায় ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে রাষ্ট্রের সমুদয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং এর ন্যায়ানুগ বণ্টন ও ব্যবহারের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, সেটি আর কখনোই সঠিক পথে ফিরে আসতে পারেনি।

১৯৯০ দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে ২০০১-পরবর্তী সরকার তথা অর্থমন্ত্রীরা বুঝে গিয়েছিলেন যে, এ দেশে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে অসৎ ব্যবসায়ী ও বিত্তবান শ্রেণির সঙ্গে আপস করে চলার কোনো বিকল্প নেই। আর সেই থেকে সম্পদশালীদের প্রত্যক্ষ করে ছাড় দিয়ে সাধারণ জনগণের ওপর লাগামহীনভাবে ভ্যাট ও অন্যান্য পরোক্ষ কর বসানোর যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেটাই অদ্যাবধি চালু আছে। এর মধ্যে ২০০৯-পরবর্তী সরকারের আমলে এটি রীতিমতো এক জঘন্য স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত হয়, যা পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে অব্যাহত ছিল। আর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সম্ভবত অতীতের স্বেচ্ছাচারী সরকারগুলোর ন্যায় অসৎ বড় ব্যবসায়ী ও বিত্তবানদের চটাতে বা অসন্তুষ্ট করতে চাচ্ছে না। এবার উল্টো দিক থেকে বলি। বিত্তবানের ওপর উচ্চহারের প্রত্যক্ষ কর কিংবা নিম্নবিত্ত সাধারণ জনগণের ওপর পরোক্ষ কর—এর কোনোটিই আর এক পয়সা না বাড়িয়েও সরকারের পক্ষে বাড়তি রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলা সম্ভব, যদি করফাঁকি রোধ করা যায়। কিন্তু বিদ্যমান করকাঠামোর আওতায় যার যতটুকু কর দেওয়ার কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা দিচ্ছে না এবং যার সম্পদের পরিমাণ যত বেশি, তার মধ্যে ফাঁকির প্রবণতাও তত প্রবল। আর কর ফাঁকিদানের এ কাজে করদাতার নিজস্ব হীনপ্রবৃত্তি যেমনি রয়েছে, তেমনি রয়েছে কর আদায়কারী প্রতিষ্ঠানসমূহের কর্মীদের যোগসাজশ, প্রশ্রয়, সহযোগিতা এবং সমঝোতামূলক আচরণও। বস্তুত এ ধরনের সমঝোতার কারণেই করফাঁকিজনিত রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলার সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন পণ্যের ওপর অতিরিক্ত হারে ভ্যাট বা পরোক্ষ কর বসানোর সহজ পন্থা। তবে করফাঁকি রোধের কাজটি যে শুধু কঠিন বলেই অচর্চিত থেকে যাচ্ছে তাই নয়, এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার অনৈতিক বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী, যা থেকে বেরিয়ে আসাটা আরও অধিক কঠিন।

কর আদায়ে পিছিয়ে পড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট জনবলের দক্ষতার অভাব এবং কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিও বহুলাংশে দায়ী। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিমাণে ও পরিসরে ব্যয়বহুল বৈদেশিক আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা হলেও সেসবের বাস্তব অগ্রগতি অনেকটাই হতাশাব্যঞ্জক। তারপরও বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রয়োজনে সে পথ থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় নেই। যেভাবেই হোক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যবস্থাপনা, কারিগরি ও প্রযুক্তিক দক্ষতার উন্নতি ঘটিয়ে এবং একই সঙ্গে এর নানা স্তর ও ক্ষেত্রে বিরাজমান অনৈতিকতার চর্চার ব্যাপ্তি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ অবশ্যই বাড়াতে হবে। তবে তা কোনো অবস্থাতেই ভ্যাটের মতো জনভোগান্তিমূলক পরোক্ষ কর আরোপের মাধ্যমে নয়। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে, বর্ধিত ভ্যাট আরোপের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আপত্তি ও প্রতিবাদ উত্থাপন করা হলেও এ বোঝা আসলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা তথা দেশের জনগণকেই বহন করতে হয়।

সব মিলিয়ে তাই মোদ্দা বক্তব্য হচ্ছে উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রয়োজনে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ অবশ্যই বাড়াতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, আহরিত সে রাজস্বের সিংহভাগ যেন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় হয় এবং তজ্জন্য রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যয়ের পরিমাণ যেন যত দ্রুত সম্ভব ব্যাপক হারে কমিয়ে আনা যায়। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ৪০ থেকে ৪৩ শতাংশই খরচ হয়ে থাকে পরিচালন ব্যয় বাবদ, যা একটি জবাবদিহিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্য আমলাতন্ত্রের সদস্যদের পেছনে খরচকৃত এ ধরনের বিলাসী অর্থ ব্যয়ের প্রচলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একেবারে জন্মলগ্ন থেকেই হয়ে আসছে। তবে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমলাতন্ত্রের এই সদস্যদের হাতে রাখতে গিয়ে সার্বিকভাবে খুশি রাখার জন্য ২০০৯-২৪ সময়কালে যা যা করা হয়েছে, সেটিকে ‘ওলটপালট করে দিলাম লুটেপুটে খা’ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এখনো কি সে ধারাই অব্যাহত থাকবে?

যেভাবেই হোক, রাষ্ট্রের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনতে হবে, ভ্যাটের ন্যায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী পরোক্ষ করারোপ থেকে যতটা সম্ভব বিরত থাকতে হবে, কর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ধনীদের ওপর প্রত্যক্ষ করারোপের পরিমাণ বাড়াতে হবে, করফাঁকি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করতে হবে, কর আদায় কার্যক্রমে দক্ষতা ও গতিশীলতা আনতে হবে এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের রাজস্বকাঠামো ও আহরণ ব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে হীন রাজনৈতিক ও অন্যবিধ স্বার্থে যখন-তখন কেউ এটিকে পরিবর্তন করতে না পারে। মোটকথা, একটি প্রগতিশীল, গণমুখী ও জনবান্ধব করকাঠামোই আমাদের কাম্য।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), শিল্প মন্ত্রণালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণায় শঙ্কা দূর হয়েছে : যুবদল নেতা আমিন

আহত নুরের খোঁজ নিলেন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশ পুনর্নির্মাণে ৩১ দফার বিকল্প নেই : লায়ন ফারুক 

চবির নারী শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ, উত্তপ্ত ক্যাম্পাস

অবশেষে জয়ের দেখা পেল ম্যানইউ

আ.লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ

আসিফের ঝড়ো ইনিংসও পাকিস্তানের জয় থামাতে পারল না

খুলনায় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা, আহত ১৫

বাবা-মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত ভাইরাল, মুগ্ধ নেটিজেনরা

ডাচদের বিপক্ষে জয়ে যে রেকর্ড গড়ল লিটনরা

১০

সাকিবের রেকর্ডে ভাগ বসালেন লিটন

১১

বিএনপিপন্থি ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের নতুন কমিটি নিয়ে নানা অভিযোগ

১২

জয়ের কৃতিত্ব কাদের দিলেন লিটন?

১৩

চায়ের দোকানে আ.লীগ নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা

১৪

ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে যা বললেন তাসকিন

১৫

বগুড়ায় বিক্ষোভ মিছিল থেকে জাপা অফিসে ভাঙচুর

১৬

প্রতিটি জেলা থেকে ট্যালেন্ট হান্ট চালু করবে বিএনপি : আমিনুল হক 

১৭

ফুল হয়ে ফোটে খাদ্য-অর্থের অভাব মেটাচ্ছে শাপলা

১৮

এফইজেবি’র নতুন সভাপতি মোস্তফা কামাল, সম্পাদক হাসান হাফিজ

১৯

নুরের শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ তথ্য জানালেন চিকিৎসকরা

২০
X