সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৭ ভাদ্র ১৪৩২
সৈয়দ আব্দুল হামিদ
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যা প্রয়োজন

স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তনে যা প্রয়োজন

বাংলাদেশে রোগব্যাধির প্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু বর্তমানে তার জায়গা নিয়েছে অসংক্রামক রোগ, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং কর্মস্থল-সম্পর্কিত নানা শারীরিক সমস্যা। এ প্রেক্ষাপটে শুধু ওষুধ, অস্ত্রোপচার কিংবা হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই যথেষ্ট নয়; রোগীর পুনর্বাসন এখন স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার মূল চালিকাশক্তি ফিজিওথেরাপি। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও স্ট্রোকের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে শরীরের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার অপরিহার্য, যেখানে ফিজিওথেরাপি কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অস্ত্রোপচার করলেও পরে ফিজিওথেরাপির অভাবে অনেকেই পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পান না। অন্যদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা প্রবীণ জনগোষ্ঠী আর্থ্রাইটিস, হাঁটু-কোমর ব্যথা, হাড় ক্ষয় ও ভারসাম্যহীনতায় ভোগেন, যেখানে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি তাদের ব্যথা কমায়, চলাফেরার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনে এবং স্বনির্ভর রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক-পরবর্তী রোগীদের অধিকাংশের রিহ্যাবিলিটেশন প্রয়োজন হয়, আর এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ফিজিওথেরাপি। বাংলাদেশে প্রতি বছর তিন লাখেরও বেশি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, যাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপি ছাড়া স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন না। একইভাবে ক্যান্সার-পরবর্তী রোগী, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় ভোগা মানুষ ও শিশুদের (যেমন সেরিব্রাল পালসি, অটিজম বা জন্মগত শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত) শারীরিক-মানসিক বিকাশ, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সক্রিয় জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও জাতীয় পর্যায়ে সুস্থতা, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনমান উন্নয়নে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাঠামোর মধ্যে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা এখনো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি)’ নিয়োগের মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে রোগীরা অনেক ক্ষেত্রে পেশাদার ও মানসম্মত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে রোগীদের বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে হয়, অথবা সঠিক সেবা না পেয়ে অক্ষম জীবনযাপন করতে হয়। এর ফলে ব্যক্তি পর্যায়ে ভোগান্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি জাতীয় পর্যায়ে দেশ অসংখ্য কর্মক্ষম মানবসম্পদ হারাচ্ছে।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠান ফিজিওথেরাপি শিক্ষা চালু করেছে। তবে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বিশেষায়নের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। দেশের কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে যেমন জাতীয় ট্রমাটোলজি ও অর্থোপেডিক পুনর্বাসন ইনস্টিটিউট, জাতীয় নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং জাতীয় শ্বাসযন্ত্র রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল—বিশেষায়িত মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে একটি দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি জনবল তৈরি করা জরুরি।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো পেশাগত মর্যাদার অভাব। ফিজিওথেরাপিকে প্রায়ই গৌণ বা সহায়ক সেবা হিসেবে দেখা হয়। অনেক চিকিৎসক ও রোগী এখনো মনে করেন, ফিজিওথেরাপি শুধু ব্যথা কমানোর একটি উপায়। অথচ উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমে ফিজিওথেরাপিস্টরা চিকিৎসা দলের অপরিহার্য সদস্য। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে প্রাথমিক থেকে তৃতীয় পর্যায়ের প্রতিটি ধাপে ফিজিওথেরাপিস্টরা সম্পৃক্ত। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় প্রতিটি হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি বিভাগ রয়েছে। ভারতের মতো দেশও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে ফিজিওথেরাপিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত পদ সৃষ্টি করেছে। ফলে রোগীদের চিকিৎসা কার্যকর হচ্ছে, রিহ্যাবিলিটেশন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিজিওথেরাপিস্টরা এখন প্রাথমিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। যুক্তরাজ্যে তারা ‘ফার্স্ট কন্টাক্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে কাজ করেন, যেখানে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই রোগীর সমস্যা মূল্যায়ন করেন। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তারা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। নিউজিল্যান্ডে প্রাথমিক পর্যায়ে পেশি-হাড়ের সমস্যার অধিকাংশ রোগীর সেবা দেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। বাংলাদেশেও গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টদের এ ভূমিকা পালনের জ্ঞান ও দক্ষতা রয়েছে, তবে নীতিগত স্বীকৃতি ও পেশাগত মর্যাদার অভাবে তারা তা প্রয়োগ করতে পারছেন না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা স্পষ্ট করা দরকার। বেসরকারি পর্যায়ে, গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টরা (যারা ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি বা সমতুল্য ডিগ্রিধারী) সব ধরনের বাত, ব্যথা, প্যারালাইসিসসহ প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি এবং/অথবা রোগীকে বিভিন্ন পরীক্ষণ, নিরীক্ষণ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রয়োগসহ উপদেশ, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগীর অঙ্গ সঞ্চালনে সব ধরনের শারীরিক সমস্যার সমাধান ও প্রতিবন্ধিতা প্রতিরোধ করে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করে থাকে। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসায় বিভিন্ন ভৌত উপাদান, থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ বা ম্যানুয়াল থেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি, ফার্মাকোথেরাপি, দৈনন্দিন কার্যক্রম সহায়ক সামগ্রী, প্রবেশগম্যতা (এক্সেসিবিলিটি), আর্গোনমিক্স এবং গবেষণালব্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীকে চিকিৎসা ও রিহ্যাবিলিটেশন সেবা প্রদান করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে নিউরোমেডিসিন স্পেশালিস্ট তার মেডিসিন চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন আর ফিজিওথেরাপিস্ট, একজন স্ট্রোক রোগীকে এসেসমেন্ট করে তার জন্য পূর্ণাঙ্গ রিহ্যাবিলিটেশন ব্যবস্থাপত্র প্রণয়ন ও চিকিৎসা প্রদান করেন, যাতে রোগী তার স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারেন।

অনেকেই ফিজিক্যাল মেডিসিন বা ফিজিয়াট্রিস্টকে ফিজিওথেরাপি স্পেশালিস্ট মনে করেন। ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন (পিএমআর) হলো অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতো একটি চিকিৎসা বিশেষত্ব। উন্নত বিশ্বে সাধারণত তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা (ফিজিয়াট্রিস্ট) রোগ নির্ণয়, ওষুধের প্রেসক্রিপশন এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকেন। অন্যদিকে, গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টরা (যারা ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি বা সমতুল্য ডিগ্রিধারী) সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তারা শারীরিক ব্যায়াম, ম্যানুয়াল থেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি এবং রোগী শিক্ষার মাধ্যমে রোগীর কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্টের পাশাপাশি ফিজিয়াট্রিস্ট রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন আর ফিজিওথেরাপিস্ট সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগীকে হাঁটতে, ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেন। এ দুই পেশার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আবার, অর্থোপেডিক সার্জন অথবা কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান (যেমন রিউমাটোলজিস্ট বা খেলাধুলাজনিত আঘাতসংক্রান্ত চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) ফিজিওথেরাপিস্টদের সরাসরি সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। রোগীকে রেফারেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে পাঠানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্ট একসঙ্গে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। ফিজিওথেরাপিস্ট থেরাপি প্রদান ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন আর চিকিৎসক রোগীর অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা তত্ত্বাবধান করেন। সফল চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের মধ্যে সমন্বিত ও নিয়মিত যোগাযোগ অপরিহার্য।

উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেমন যুক্তরাজ্যে হাসপাতলের প্রতিটি ফিজিওথেরাপি ইউনিটে একজন সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্টের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট, সহকারী এবং প্রশাসনিক কর্মী কাজ করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের একটি মাঝারি আকারের হাসপাতালে অন্তত দুই থেকে চারজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি) নিয়োগ করা প্রয়োজন, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক রোগী, বিশেষত নারী রোগীরা, মহিলা ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পাশাপাশি দুই থেকে তিনজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং অন্তত একজন প্রশাসনিক কর্মী থাকা অপরিহার্য। নির্দিষ্টভাবে বলা যেতে পারে, গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে তিন সদস্যের একটি ফিজিওথেরাপি ইউনিট রাখা যেতে পারে—একজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি) এবং দুজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি), যাদের একজন পুরুষ ও একজন মহিলা হওয়া উচিত। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে, সেখানেও অনুরূপ একটি ফিজিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত পাঁচ সদস্যের একটি দল থাকা জরুরি, যার মধ্যে দুজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং একজন রিসেপশনিস্ট বা প্রশাসনিক কর্মী থাকবেন। জেলা হাসপাতালের ক্ষেত্রে একজন সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্টের নেতৃত্বে চারজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি), আটজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং একজন প্রশাসনিক কর্মীর সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি ইউনিট গড়ে তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রেসক্রিপশনের অধিকার নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে, যেমন—যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায়, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্টরা সীমিত প্রেসক্রিপশনের অধিকার পান। বিশেষ করে প্রাথমিক সেবার স্তরে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পুনর্বাসন-সংক্রান্ত প্রেসক্রিপশন প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ কাঠামোর অনুপস্থিতির কারণে বর্তমানে যারা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) হিসেবে কাজ করছেন, তাদের সংগত কারণে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করতে হচ্ছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) ও গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টদের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা (ফিজিওথেরাপি) সাধারণত তিন-চার বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিজিওথেরাপিস্টের অধীনে চিকিৎসাসেবা দেন। অন্যদিকে ফিজিওথেরাপিস্টরা পাঁচ বছরের বিস্তৃত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে স্বাধীনভাবে রোগী মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করার মতো দক্ষতা অর্জন করেন। বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন অনুযায়ী স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যূনতম তিন বছরমেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি (ফিজিওথেরাপি) ডিগ্রিধারী ব্যক্তিরা ‘মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি)’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত হন যারা একজন ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে সেবা প্রদান করেন। তাদের কাজ মূলত ফিজিওথেরাপিস্টের নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন থেরাপিউটিক সরঞ্জাম পরিচালনা এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত পরিধি ফিজিওথেরাপিস্টদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) কখনোই স্বাধীনভাবে রোগী দেখতে বা চিকিৎসাপত্র প্রদান করতে পারেন না।

ফিজিওথেরাপি প্রফেশন নিয়ে এ বিভ্রান্তি দূর করতে দ্রুত সময়ে রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল থেকে ফিজিওথেরাপিস্টদের নিবন্ধন ও মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিকমানের কারিকুলাম প্রণয়ন, উচ্চতর ডিগ্রি চালু ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি। ফিজিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিস্ট, নার্স, ডায়েটিশিয়ানসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যান্য সমন্বিত দল গঠন করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচির ব্যবহার জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা আরও সহজলভ্য করা সম্ভব। টেলি-রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার রোগীরাও বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের সেবা পেতে পারেন। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে এটি সফলভাবে চালু আছে, বাংলাদেশেও তা কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। রোগীর দ্রুত পুনর্বাসন সম্ভব হবে, হাসপাতালের শয্যা খালি হওয়ার হার বাড়বে, চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। সর্বোপরি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, যা স্বাস্থ্যসেবার আসল লক্ষ্য। বাংলাদেশ এখন স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তরের পথে। শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীর পূর্ণ সুস্থতা ও কর্মক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত করাই হলো আসল উদ্দেশ্য। ফিজিওথেরাপিস্টরা সেই উদ্দেশ্য পূরণে অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই স্বাস্থ্যসেবায় ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। স্বাস্থ্যনীতি, বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তাদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি টেকসই ও আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চীন থেকে ফিরেই নুরকে দেখতে গেলেন নাহিদ-সারজিসরা

৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ / বিএনপির অবারিত সুযোগ, আছে চ্যালেঞ্জও

বিএনপির প্রয়োজনীয়তা

ঢাকায় আবাসিক হোটেল থেকে মার্কিন নাগরিকের মরদেহ উদ্ধার

ক্যানসার হাসপাতালকে প্রতিশ্রুতির ১ কোটি টাকা দিচ্ছে জামায়াত

ম্যানেজিং কমিটি থেকে বাদ রাজনৈতিক নেতারা, নতুন বিধান যুক্ত

হত্যার উদ্দেশ্যে নুরের ওপর হামলা : রিজভী

প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দিলে ব্যয়বহুল চিকিৎসা চাপ কমবে

চবি ও বাকৃবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জবি ছাত্রদলের বিক্ষোভ

চবি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ইবিতে বিক্ষোভ

১০

চাকরির মেয়াদ বাড়ল র‍্যাবের ডিজি ও এসবি প্রধানের 

১১

বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের হামলা

১২

চট্টগ্রামে স্কুল থেকে চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩

১৩

পিটার হাস বাংলাদেশে, নির্বাচনের আগে আবার আলোচনায়

১৪

বিদেশি পিস্তলসহ যুবক গ্রেপ্তার

১৫

রূপসা সেতুর নিচ থেকে সাংবাদিকের মরদেহ উদ্ধার

১৬

চবিতে সংঘর্ষের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত চান চসিক মেয়র শাহাদাত

১৭

কুকুর ঘেউ ঘেউ করায় মালিককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ

১৮

আটক ১৪ বাংলাদেশিকে ফেরত দিল বিএসএফ

১৯

উচ্চশিক্ষায় গবেষণাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে : রুয়েট উপাচার্য

২০
X