মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। মশা চিরকালীন বিরক্তিকর একটি নাম, যা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় আসে কানের কাছে ভন ভন করা আর ত্বকের জ্বালাযুক্ত কামড়। মশা এক যন্ত্রণাদায়ক পতঙ্গ। বিরক্তিকর উপদ্রবের পাশাপাশি তারা রোগজীবাণু সংক্রমণ ঘটায়। মশা অন্যতম এক আতঙ্কের নাম।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে পৃথিবীতে মশার অস্তিত্ব আছে। বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশার মধ্যে অ্যানোফিলিস, এডিস, কিউলেক্স প্রজাতির মশা মানুষের জন্য ক্ষতিকর। মশাবাহিত রোগগুলোর মধ্যে ম্যালেরিয়া সবচেয়ে পুরোনো রোগ। খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে গ্রিস ও চীনে এ রোগের অস্তিত্ব ছিল।
মশা কামড়ানোর সময় একটি ব্যথানাশক তরলও শরীরে প্রবেশ করায়, ফলে কামড়ানোর সময় তেমন অনুভূতি হয় না। অধিকাংশ প্রজাতির স্ত্রী মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীর রক্ত পান করে থাকে। কিছু মশা রোগজীবাণু সংক্রামক। যেসব মশা নিয়মিত মানুষকে কামড়ায়, তারা প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষের শরীরে রোগজীবাণু সংক্রমণের চলক হিসেবে কাজ করে। মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া, পীতজ্বর, জিকা ভাইরাস ও অন্যন্য প্রাণঘাতী রোগ সংক্রমিত হয়ে থাকে। সংক্রমিত রোগের জন্য দায়ী এ মশাই।
মশার কামড়ে শুধু যে চুলকানি ও জ্বালাপোড়া হয় তা নয়, বরং মশা বিভিন্ন রোগের বাহক হিসেবেও কাজ করে। মশা সাধারণত গ্রীষ্মপ্রধান এবং নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় বেশি দেখা যায়। মশা এক ধরনের ক্ষুদ্র পোকা, যা মানুষের রক্ত চুষে বেঁচে থাকে। স্ত্রী মশাই মূলত রক্ত খেয়ে থাকে, পুরুষ মশা ফুলের রস দিয়ে জীবিত থাকে। মশা কিন্তু রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে না। মূলত রক্তের প্রোটিন অংশটি কাজে লাগিয়ে তারা ডিম পাড়ে। তাইতো পুরুষ মশা কখনো হুল ফোটায় না। পুরুষ মশা শুধু একদিন বাঁচে। নারী মশা সচরাচর ছয়-আট সপ্তাহ বেঁচে থাকে। আর পুরুষ মশা একদিনের বেশি বাঁচলেও তাদের পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক হয়ে পড়ে। এ ছোট মাছি প্রজাতির পতঙ্গ আড়াই হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীতে মশার সংখ্যা এত বেশি যে, কোনোদিনই মশা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। আর মানুষের সব ধরনের মশা নির্মূলের প্রয়োজনও নেই। এডিস, অ্যানোফিলিস ও কিউলেক্স মশাই মূলত মানুষের শত্রু।
মশাকে যতই তুচ্ছ ও অবহেলা করা হোক না কেন, জীবাণু সংক্রমণকারী এ মশাই পৃথিবীতে সবচেয়ে জীবনঘাতী পতঙ্গ। মশা এমনিতে ক্ষুদ্র হলেও এর প্রভাব মোটেও ছোট নয়। মশার কামড় আমাদের জীবন ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হওয়ার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। সেদিক থেকে এটা পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধবাজ দেশ, জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। প্রতি বছর এ ক্ষুদ্র জীবটি লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে। ম্যালেরিয়া ছাড়াও ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়া, ওয়েস্ট নাইল, ইয়োলো ফিভার ইত্যাদি রোগ মশা ছড়ায়। কাজেই মশাকে ক্ষুদ্র করে দেখার সুযোগ নেই।
পৃথিবীতে ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির মশা উড়ে বেড়াচ্ছে। এসব মশার শতকরা মাত্র ছয় ভাগ হলো স্ত্রী মশা এবং এরাই মানুষকে কামড়ায়, মানুষের রক্ত খায়। এই ছয় ভাগের অর্ধেক, অর্থাৎ মাত্র শতকরা তিন ভাগ মশা মানুষের শরীরে রোগজীবাণুর সংক্রমণ ঘটায়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই তিন ভাগ মশা মেরে সাফ করতে পারলে লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে। মশাবাহিত ভাইরাস থেকে নিজেকে রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার কামড় এড়ানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মশারোধী স্প্রে ব্যবহার করা। বাড়ির আশপাশে যে কোনো ছোট পাত্রে স্থায়ী পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করা। মশার কামড় হতে পারে প্রাণঘাতী। তাই সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা
মন্তব্য করুন