বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মো. তানজিল হোসেন
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৫ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন সময়ের দাবি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন সময়ের দাবি

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার কেন্দ্র নয়; বরং গণতান্ত্রিক চর্চা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনের অন্যতম ক্ষেত্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছে, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং সুস্থ ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেন জরুরি এবং কীভাবে তা কার্যকর করা সম্ভব, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা

ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। এর মাধ্যমে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের অনুশীলন করে, নেতৃত্ব গঠনের অভিজ্ঞতা লাভ করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। কার্যকর ছাত্র সংসদ হোস্টেল ব্যবস্থাপনা, গ্রন্থাগার সেবা, ক্যান্টিনের মান নিয়ন্ত্রণ, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। একই সঙ্গে, নির্বাচিত নেতৃত্ব প্রশাসনের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করে, যা অহেতুক আন্দোলন বা সহিংসতা কমাতে সহায়ক। সবচেয়ে বড় কথা, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে, যা ভবিষ্যতে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ইতিবাচক অবদান যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নেতিবাচক দিকও। বিশেষ করে গত সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে দমননীতি চালিয়েছে। বিরোধী ছাত্রসংগঠনের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বাধ্য করার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আতঙ্ক ও অস্থিরতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ধ্বংস করেছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

নতুন বাস্তবতা ও জবাবদিহির দাবি

যদিও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আইন করে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সরকার কখনোই তা বাস্তবায়নে সফল হয়নি। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণআন্দোলনের পরও ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি প্রবলভাবে উঠেছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেই দাবি পূর্ণ করতে পারেনি। বাস্তবতা হলো, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ছাত্ররাজনীতি দমন করা সম্ভব হয়নি। তাই কার্যকর সমাধান হতে পারে ছাত্রনেতাদের সরাসরি শিক্ষার্থীদের কাছে দায়বদ্ধ করা। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে নেতারা জানবেন, তাদের কর্মকাণ্ডের জবাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছেই দিতে হবে। এভাবে ছাত্ররাজনীতির ইতিবাচক দিক টিকে থাকবে, আর নেতাদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

পুরোনো বনাম নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (DU), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (RU) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (JU) ছাত্র সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, যেমন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (JKKNIU), ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, এখানে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পুরোনো ও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বৈষম্য তৈরি হয়েছে।

সমস্যার সমাধান

১. আইন সংশোধন: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬ সংশোধন করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিধান সংযোজন করতে হবে।

২. অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ: দলীয় প্রভাব এড়িয়ে অরাজনৈতিক ছাত্র সংসদ গঠন করা যেতে পারে।

৩. পাইলট উদ্যোগ: প্রথমে কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে।

৪. কঠোর আচরণবিধি: নির্বাচনী সহিংসতা রোধে আচরণবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

৫. বিকল্প কাঠামো: আইন সংশোধনের আগে অস্থায়ীভাবে শিক্ষার্থী কল্যাণ পরিষদ বা সাংস্কৃতিক কাউন্সিল চালু করা যেতে পারে।

আইনি সমাধান: অর্ডিন্যান্সের সুযোগ

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে কোনো নির্বাচিত সরকার নেই; অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এ পরিস্থিতিতে সংসদ কার্যকর নয়। তবে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চাইলে অধ্যাদেশ (Ordinance) জারি করে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করতে পারেন। অর্থাৎ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬ সংশোধন করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিধান সংযোজন এখনই সম্ভব। পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ বসলে এ অধ্যাদেশকে আইন আকারে অনুমোদন দিতে হবে। এভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করা যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের করণীয়: অধ্যাদেশের উদ্যোগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬-এ যেহেতু ছাত্র সংসদের কোনো বিধান নেই, তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নেওয়া। প্রথমে সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের যৌথ সভায় একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাস করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বার্থে নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে। পরে এ প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ সুপারিশের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারির সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অস্থায়ীভাবে হলেও আইন সংশোধন হয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পথ সুগম হতে পারে।

প্রশাসনের করণীয়

সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে—

১. নিরপেক্ষ পরিবেশ সৃষ্টি ও সহিংসতার ঝুঁকি হ্রাস করা।

২. সঠিক ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা।

৩. একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন।

৪. প্রার্থীদের জন্য কঠোর আচরণবিধি প্রণয়ন।

৫. প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বচ্ছ ভোট গ্রহণ ও দ্রুত ফলাফল নিশ্চিত করা।

৬. নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। তাদের গণতান্ত্রিক চর্চা থেকে বঞ্চিত রাখা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন হলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পিছিয়ে রাখা বৈষম্যমূলক। বাস্তবে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ছাত্ররাজনীতি দমন করা যায়নি; বরং তা আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়েছে। এখন সময় এসেছে ছাত্রনেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনে নিয়মিত ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার। প্রয়োজনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অধ্যাদেশ জারি করেই বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংশোধন করা যেতে পারে।

একটি সুষ্ঠু ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুধু শিক্ষার্থীদের অধিকারই নিশ্চিত করবে না, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এ পরিবেশ থেকেই তৈরি হবে দায়িত্বশীল, দূরদর্শী ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব—যারা দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আলভারেজকে নিয়ে রিয়ালের ‘মেগা বিড’, প্রত্যাখ্যানের ঘোষণায় চমকে দিল অ্যাটলেটিকো 

সম্পদ-দলীয় প্রতীক সবই হারাচ্ছেন মমতা!

বিমান বাহিনীর ১৩১তম জুনিয়র কমান্ড ও স্টাফ কোর্সের সনদপত্র বিতরণ

চিকিৎসকদের নিয়ে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ড্যাব

সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় চোখে আলো ফিরেছে ৮৪ জনের

বাজেটে মোবাইল, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিপণ্যে বড় সুখবর

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্বকাপ উন্মাদনায় দেশের পতাকা থাকুক সবার উপরে

গাজায় সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রীর ওপর ফ্রান্সের নিষেধাজ্ঞা

ঢাকায় নিখোঁজ জবি শিক্ষার্থীর বাবা, সন্ধান চায় ছেলে

১০

নতুন রিসাইক্লিং উদ্যোগ / ৯০ শতাংশর বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ

১১

সরকারি বাঙলা কলেজে অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা

১২

বাংলার নদী, বাংলার জীবন : ইতিহাস থেকে বর্তমান অবস্থা

১৩

ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয় : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ‘হিট’ প্রকল্পের আওতায় ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত

১৫

ল্যাবএইডে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সেমিনার অনুষ্ঠিত

১৬

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় পতন

১৭

কক্সবাজারে ১৯ রোহিঙ্গা আটক

১৮

হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় পিছু হটল ইসরায়েলি বাহিনী

১৯

ব্রাজিলের পতাকা টানাতে গিয়ে কিশোরের মৃত্যু

২০
X